55 বার প্রদর্শিত
"পড়াশোনা" বিভাগে করেছেন

1 উত্তর

+1 টি ভোট
করেছেন
কপিরাইট মূলত দুটি শব্দের সম্মিলন। কপি এবং রাইট। কপি অর্থ নকল বা প্রতিলিপি বা অনুলিপি বা অনুকৃতি বা অনুকরণ বা অনুসৃতি ইত্যাদি। আর রাইট হচ্ছে অধিকার বা স্বত্ব বা সত্য বা ন্যায় ইত্যাদি। সহজ ভাষায় বলতে পারি, কপিরাইট হচ্ছে নকল করার অধিকার বা নকলাধিকার। যিনি নতুন কিছু সৃষ্টি করেন, তিনি তাঁর সেই সৃষ্টি অন্যকে জানাতে চান বা অন্যকে ব্যবহার করতে দিতে চান। তখন সেই সৃষ্টিকর্মের আরো অনুলিপি বা নকল বা কপি প্রয়োজন হয়। এই ধরনের কপি বা অনুলিপি বা নকল করার অধিকার রাখেন কেবল সেই সৃষ্টিকর্মের স্রষ্টা। আর রাখেন তিনি, যাকে সেই শিল্পস্রষ্টা বৈধ অনুমতি দিয়েছেন। আমাদের দেশে গ্রন্থের ক্ষেত্রেই এই ধারণাটি সমধিক প্রচলিত। বাংলায় কপিরাইটের বহুল প্রচলিত পারিভাষিক অর্থ করা হয়েছে ‘মেধাস্বত্ব’। বাংলা একাডেমী ইংলিশ-বেঙ্গলি ডিকশনারিতেও কপিরাইটের অর্থ ‘মেধাস্বত্ব’; ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘কোনো লেখক বা শিল্পী কর্তৃক তাঁর সৃষ্টিকর্মের উপর একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্থায়ী অধিকার।’ কপিরাইটের মৌলিক তাৎপর্যের সঙ্গে এই অর্থের কোনো বিরোধ না থাকলেও কপিরাইটের যে ক্রমসম্প্রসারমান ক্ষেত্র ও পরিধি, তা এই ব্যাখ্যায় পূর্ণ-প্রতিফলিত নয়। এটি বরং ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি-র বাংলা পারিভাষিক শব্দ হিসেবে অধিক সঙ্গতিপূর্ণ। কপিরাইট ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির একটি অংশ, অন্য অংশ ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল রাইট, যার মধ্যে রয়েছে প্যাটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক। তাই কপিরাইটের তাৎপর্য আলাদাভাবে অনুধাবনযোগ্য। কপিরাইট কেবল লেখক বা শিল্পীর বিষয় নয়, এটি যে কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের সৃষ্টিস্বত্বের চর্চাক্ষেত্র। কেবল বৃহত্তর জনসাধারণ নয়, কপিরাইট সম্পর্কে আমাদের শিক্ষিত সমাজের ধারণাও যে খুব গোছালো ও সময়ানুগ নয়, এই পরিভাষা ও ব্যাখ্যা তার একটি সহজ উদাহরণ। আমি প্রসঙ্গটি উত্থাপন করছি এ-কারণে যে, কপিরাইট-লঙ্ঘনসহ এ-সম্পর্কিত যাবতীয় ভুল-বোঝাবুঝি, অব্যবস্থাপনা ও প্রয়োগহীনতার মূল কারণ কপিরাইট সম্পর্কে আমাদের দেশে এর স্রষ্টা, স্বত্বাধিকারী, মধ্যস্বত্বভোগী, ব্যবহারকারী, ব্যক্তি ও সামষ্টিক পর্যায়ে ব্যবহারকারী, শাসক, প্রশাসক, আমলা, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন মহলে ও পর্যায়ে প্রার্থিত ও আবশ্যকীয় সচেতনতার অভাব। বলাবাহুল্য, সেইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট বা যৌথ ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে প্রশিক্ষিত জনবল, অবকাঠামো ও প্রযুক্তির অপ্রতুলতা। বিশেষ অধিকার: আমাদের বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করতে হবে যে, কপিরাইট হচ্ছে লেখক, চিত্রকর, সঙ্গীতশিল্পী বা অনুরূপ অন্য কোনো শিল্প-স্রষ্টা ও পারফরমারের অধিকার। শিল্প-স্রষ্টা ও পারফরমার একক বা যৌথও হতে পারেন। অধিকার বলতে শিল্প-স্রষ্টা বা পারফরমার কর্তৃক নতুন কিছু সৃষ্টি করার অধিকার, সেই সৃষ্টি-কর্মের কপি বা অনুলিপি তৈরি করার অধিকার এবং সেই অনুলিপির ব্যবসায়িক বা অব্যবসায়িক সকল প্রকার ব্যবহার থেকে প্রাপ্ত সুফল ভোগ করার জন্মগত অধিকার বোঝায়। এই অধিকারের পরিপ্রেক্ষিত নানাবিধ ঃ নৈতিক, নান্দনিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বিদ্যমান আইনে কপিারাইটের মেয়াদ স্রষ্টার জীবৎকাল ও তার মৃত্যুর পর ষাট বছর। এর পর তা মানবজাতির সাধারণ স¤পদে পরিণত হয়ে যায়। তার আগে এই অধিকার একান্তই ব্যক্তি বা যৌথ-স্রষ্টার। মেয়াদকালে শিল্প-স্রষ্টা ও পারফরমারের বৈধ অনুমতি ছাড়া তাঁর বা তাঁদের কর্মের অনুলিপি ও ব্যবহার আইনত দ-নীয় অপরাধ। অবৈধ নকলকারী, ব্যবসায়ী, ব্যবহারকারী ও তাদের সহযোগীরা আইনের চোখে অপরাধী। বাংলাদেশে এ অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে কতকটা আমাদের অনেকের জ্ঞাতসারেই। কপিরাইটের আওতা: বিদ্যমান আইনের আওতায় যে সব কর্মের ক্ষেত্রে কপিরাইট বা মেধাস্বত্বের সুরক্ষা (প্রটেকশন) প্রদান করা হয়েছে, সেগুলো নিম্নরূপ : সাহিত্যকর্ম, নাট্য ও সঙ্গীতকর্ম, শিল্পকর্ম, স্থাপত্য কর্ম, চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র বিষয়ক কর্ম, রেকর্ডকর্ম, অডিও-ভিডিও ক্যাসেট, বেতার ও টেলিভিশন তথা মিডিয়া সম্প্রচার, ক্যাবল নেট-ওয়ার্কস, কম্পিউটার সফটওয়ার ও ওয়েবসাইট সংক্রান্ত কর্ম। অধিকারের সুস্পষ্ট তিনটি দিক : অধিকারের স্বীকৃতি, সুরক্ষা ও আদায়। একটি কর্ম সৃষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা জন্মগত অধিকারের ভিত্তিতে স্বীকৃত হয়ে যায়। স্রষ্টা বা প্রণেতা তা যথাসময়ে কপিরাইট অফিসে বা সমিতিতে রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করতে পারেন। স্বীকৃতির জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়, তবে কোনো বিষয়ে প্রতিকার লাভের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। বিদ্যমান আইনের (২০০০) দশম অধ্যায়ে এ বিষয়টি পদ্ধতিগতভাবে বর্ণিত হয়েছে। সুরক্ষা বা প্রটেকশনের জন্য প্রথম শর্ত ইউজার অ্যাগ্রিমেন্ট বা স্বত্ব-নিয়োগের জন্য বিধিমোতাবেক লিখিত চুক্তি সম্পাদন। কপিরাইট আইনের (২০০০) ১৯ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘(১) কোন কর্মের কপিরাইটের স্বত্ব নিয়োগ বৈধ হইবে না, যদি তাহার স্বত্ব প্রদানকারী বা তাহার নিকট যথাযথ ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির দ্বারা স্বাক্ষরিত না হয়।’ অর্থাৎ চুক্তিটি লিখিত ও স্বাক্ষরিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এই ধারার ৭টি উপধারায় চুক্তিসম্পাদনের নিয়ম ও শর্তাবলী উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তফসিলে চুক্তির কোনো নমুনা দেওয়া হয়নি। তাই শর্ত মোতাবেক চুক্তিসম্পাদনকারীরা নিজ নিজ কাঠামোতে চুক্তি প্রণয়ন, সম্পাদন ও স্বাক্ষর করতে পারেন। অবশ্য পালনীয় শর্তের মধ্যে রয়্যালটি পরিশোধের ধরন ও চুক্তির মেয়াদ উল্লেখ থাকতে হবে। যদি চুক্তিতে মেয়াদ উল্লেখ না থাকে, তাহলে স্বত্ব-নিয়োগের পাঁচ বছর পর মেয়াদ অবসিত হবে (ধারা ১৯-৫)। একইভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত স্বত্বাধিকারী যদি চুক্তির কোনো শর্ত এক বছর পর্যন্ত পালন না করেন, তাহলে চুক্তিটি বাতিল হয়ে যেতে পারে (ধারা ১৯-৩)। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে চুক্তি সম্পাদন ও পালনে উভয় পক্ষকে সর্বাধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অধিকার আদায়ের জন্য সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈধ স্বত্বাধিকারীরা কপিরাইট সোসাইটি গঠন করে কপিরাইট অফিস থেকে নিবন্ধন গ্রহণ করতে পারেন। একই বিষয়ে দুটি কপিরাইট সোসাইটি নিবন্ধন করা যাবে না। তবে সব বিষয়ে গঠিত সোসাইটি নিয়ে বাংলাদেশ-ভিত্তিক একটি সমন্বয়কারী সোসাইটি গঠিত হতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে এই উভয় ধরনের সোসাইটি আছে। এরাই লেখক, শিল্পী, পারফরমারসহ সকল স্বত্বাধিকারীর স্বত্ব দেখাশোনা করে থাকে। বিদ্যমান আইনের (২০০০) অষ্টম অধ্যায়ে এবং ২০০৬ সালের কপিরাইট বিধির পঞ্চম অধ্যায়ে কপিরাইট সমিতি গঠন, নিবন্ধন ও পরিচালনার বিষয়াদি বর্ণিত হয়েছে। পাইরেসি বা তাস্কর্য: পাইরেসি অর্থ তাস্কর্য। সোজা কথায় তস্কর বৃত্তি, যা স্পষ্টত মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন। এর উদাহরণ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে দেওয়া যায়। যেমন, বৈধ চুক্তিবিহীন গ্রন্থপ্রকাশ থেকে শুরু করে পুরো গ্রন্থের অননুমোদিত ফটোকপিকরণ, নকল সিডি, নকল সফটওয়ার কিংবা মোবাইল ফোনের রিংটোনে সঙ্গীতের যথেচ্ছ ব্যবহার ইত্যাদি। অবৈধ নকল বলতে হুবহু, পুরোপরি বা আংশিক নকল বোঝায়। আংশিক নকল বলতে যে কর্মে কপিরাইট বিদ্যমান আছে তেমন কোনো কর্মের অনুমতিহীন ব্যবহার বোঝায়। উদাহরণ স্বরূপ, জেমস ওয়াটের ফর্মূলার সঙ্গে নিজস্ব ফর্মূলার সমন্বয় ঘটানো যেতে পারে, কেননা বর্তমানে ওয়াটের প্রদত্ত জ্ঞান কপিরাইটমুক্ত সর্বজনীন জ্ঞান। কিন্তু সেই ফর্মূলার সঙ্গে কোনো জীবিত বা কপিরাইটের অধিকারী উদ্ভাবকের ফর্মূলা তাঁর বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা যাবে না। শেক্সপীয়রের রচনা প্রকাশে বাধা নেই, কিন্তু তাঁর উপর রচিত কোনো রচনা প্রকাশ করতে হলে সংশ্লিষ্ট গবেষকের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। কম্পিউটারের জন্য নতুন কোনো সফটওয়্যার বা কী-বোর্ডে কপিরাইট বিদ্যমান আছে এমন কোনো সফটওয়্যার বা কী-বোর্ডের সনাক্তযোগ্য প্রতিফলন থাকলে তার জন্যে পূর্বতন স্বত্বাধিকারীর বৈধ অনুমতি নিতে হবে। সনাক্তযোগ্য প্রতিফলন সম্পর্কিত বিরোধ কপিরাইট বোর্ড ও আদালতে মীমাংসা করা যাবে। প্রতিকারের বিষয়টি চতুর্দশ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাইরেসি বা লঙ্ঘন-জনিত অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের জেল, অর্থদ- ও যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা আছে। বিদ্যমান আইনে এই ধরনের লঙ্ঘনজনিত অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর কারাদ- ও পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা। একজন সাব-ইন্সপেক্টর বা তদূর্ধ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা পরোয়ানা ব্যতিরেকে লঙ্ঘনকারীকে গ্রেপ্তার এবং তার যাবতীয় যন্ত্রপাতি ও মালামাল জব্দ করতে পারেন। কপিরাইট আইনের ‘অপরাধ ও শাস্তি’ শীর্ষক পঞ্চদশ অধ্যায়ে এ-সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য আছে। এই আইন বাংলাদেশ ছাড়াও আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বার্ণ কনভেনশনভুক্ত সকল দেশের কর্ম, স্বত্বাধিকারী ও অন্যান্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কপিরাইট অফিস থেকে প্রকাশিত ‘এশিয়ান কপিরাইট হ্যান্ডবুকে’ও এ-সম্পর্কে আলোচনা আছে। আরো সহজবোধ্য ভাষায় ও সংক্ষিপ্ত কলেবরে এই আইনের সারাংশ প্রণয়ন ও প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে প্রচার করা যেতে পারে। লেখক, শিল্পী ও সকল ক্ষেত্রের স্বত্বাধিকারীরা কপিরাইট সমিতি গঠনের পাশাপাশি সেমিনার, পাঠচক্র ইত্যাদির মাধ্যমে স্বপ্রশিক্ষণ ত্বরান্বিত করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের পাঠক্রমে কপিরাইট অন্তর্ভুক্ত করা জরুরী। সবচেয়ে বেশি জরুরি, স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনদের উপলব্ধি ও প্রাপ্য আদায়ের জন্য কার্যকরী উদ্যোগ। তা না হলে কপিরাইট প্রয়োগের দিকটি কেবল বিলম্বিত হতে থাকবে। উৎস: bdnews24

সম্পর্কিত প্রশ্নগুচ্ছ

নির্বিক এমন একটি ওয়েবসাইট যেখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন এবং পাশাপাশি অন্য কারো প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলে তাদের উত্তর দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন।
...