নিরভিকে ডট কমে আপনাকে স্বাগতম।এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।প্রশ্ন করতে Ask a Question ক্লিক করুন।
30 views
asked in বিজ্ঞান by (1,625 points)
closed by
closed with the note: only admin can answere this

1 Answer

0 like 0 dislike
answered by (1,625 points)
 
Best answer

প্রজাতির উৎপত্তি

বিবর্তনের ফলে বেশ কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। পপুলেশনে নতুন বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব ঘটতে পারে (যেমন: ব্যাক্টেরিয়া এন্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী [২.৩.৩ দ্রষ্টব্য] হয়ে উঠতে পারে) বা কোনো বৈশিষ্ট্য চিরতরে লোপ পেতে পারে (যেমন: কেঁচোর চোখহীন হয়ে পড়া)। প্রজাতি বিলুপ্ত হতে পারে (যেমন: ডাইনোসরের বিলুপ্তির কারণ প্রাকৃতিক নির্বাচন; এক্ষেত্রে উল্কাপাত ছিল পরিবেশের প্রধান নিয়ামক, যার সাপেক্ষে তারা সবাই অযোগ্য হয়ে পড়ে)। আবার নতুন প্রজাতির উৎপত্তি হতে পারে (যেমন: একই পূর্বপুরুষ থেকে একদিকে বানর আর অন্যদিকে মানুষের উদ্ভব ঘটেছে)। প্রজাতির উৎপত্তি (speciation) কী করে হয় তা জানতে হলে আগে বুঝতে হবে প্রজাতি কাকে বলে।

সময়ের সাথে সাথে প্রজাতির মতো প্রজাতির সংজ্ঞারও বিবর্তন ঘটেছে। একটা সময় ছিল যখন জীববিজ্ঞানীরা ইচ্ছেমতো (arbitrarily) বেছে নেওয়া বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে জীবজগতকে নানা প্রজাতিতে ভাগ করতেন। ফলে দেখা যেতো বিভিন্ন জীব নিয়ে গঠিত একটি নির্দিষ্ট সেটকে একেক বিজ্ঞানী একেক রকম ভাবে প্রজাতি-বিভক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে ডারউইনের ‘প্রজাতির উৎপত্তি’ গ্রন্থে আমরা পাই, “... বহুরূপী গণগুলোর অধীনে জনাব বাবিংটন ২৫১ টি প্রজাতি আছে বলেছেন। আর জনাব বেন্থামের হিসেবে ১১২ টি।” ডারউইন প্রজাতিকে সদা পরিবর্তনশীল ও গতিশীল সত্ত্বা হিসেবে দেখতেন, যার এক একটি পর্যায়কে হিসাবের সুবিধার্থে আমরা এক একটি আলাদা প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করি। এটা প্রাকৃতিক বিভাজন নয়, মানবসৃষ্ট। তাই নানা মুনির নানা মত। এই শেডের কালো কোথায় শেষ আর সাদা কোথায় শুরু চিহ্নিত করো:

দুটি প্রজাতি কালো আর সাদার সীমারেখা টানা নিয়ে তোমার-আমার মধ্যে মতের মিল না থাকতে পারে তবে এটা তো ঠিক যে কালো ধীরে ধীরে হালকা হয়ে সাদা হয়েছে (অথবা এর বিপরীত)। ঠিক তেমনি ডারউইনের মতে, প্রজাতির সীমানা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও এটা মিথ্যা হয়ে যায় না যে এক প্রজাতি অন্য প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে।

বর্তমানে অবশ্য প্রজাতির আরো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়: ‘জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে যৌনজনন করতে সক্ষম দুটি জীব (একটি পুরুষ অপরটি স্ত্রী) একই প্রজাতির বলে গণ্য হবে যদি ও কেবল যদি তাদের জননকোষের মিলনে এমন সন্তান উৎপাদিত হয় যা নিজে জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রজননক্ষম।’ তাহলে এই সংজ্ঞা ব্যবহার করে দুটি পুরুষ জীব (ধরা যাক, ক ও খ) একই প্রজাতির কিনা তা কী করে বুঝবো? মনে করো এমন স্ত্রী জীব গ আছে যা ক ও খ উভয়ের সাথেই প্রজননক্ষম সন্তান উৎপাদন করতে পারে। যদি তেমন গ পাওয়া যায় তাহলে বলা যাবে ক ও গ একই প্রজাতির এবং খ ও গ একই প্রজাতির। সুতরাং ক ও খ একই প্রজাতির। যদি তেমন গ এর থাকা অসম্ভব হয় তবে ক ও খ ভিন্ন প্রজাতির। প্রজাতির এই সংজ্ঞার সুবিধা হলো, এতে প্রজাতির সীমারেখা সুস্পষ্ট। এই সংজ্ঞা অনুসরণ করলে প্রজাতি গণনায় সব মুনিরই একই মত হবে। আর অসুবিধা হলো, বিলুপ্ত প্রজাতি যাদের কেবল ফসিল পাওয়া যায় জ্যান্ত জীব পাওয়া যায় না, তাদের বেলায় প্রযোজ্য নয় কারণ এখন আর তাদের সন্তান উৎপাদন করিয়ে প্রজাতি-যাচাই করা সম্ভব নয়। আরো একটি অসুবিধা হলো, যৌনজনন করে না এমন জীবের বেলায় প্রযোজ্য নয়। এসব অসুবিধা সাধারণত এখন আণবিক জীববিজ্ঞান ও জীনতত্ত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা হয়। জীনতত্ত্বের এমন পদ্ধতি আছে যার মাধ্যমে বিলুপ্ত জীব এবং অযৌন-জননকারী জীবের প্রজাতি বেশ সূক্ষ্ণতার সাথে যাচাই করা যায়। এখানে নানা মুনির নানা মত হওয়ার সুযোগ তেমন নেই। উল্লেখ্য, জীনতত্ত্ব কিন্তু যৌনজননকারী জীবদের প্রজাতিও যাচাই করতে পারে।

প্রজাতির উৎপত্তির যতগুলো ব্যাখ্যা বা প্রক্রিয়া আবিষ্কৃত হয়েছে তার অধিকাংশের মধ্যে একটা ব্যাপারে মিল আছে। একটি প্রজাতি থেকে অন্য একটি প্রজাতি যতভাবে উদ্ভূত হতে পারে তার প্রায় সব উপায়ে কিছু না কিছু পরিমাণে প্রজনন-বাধা (reproductive isolation) থাকে। একই প্রজাতির দুইটি পপুলেশন যদি নিজেদের মধ্যে প্রজনন ক্রিয়া সস্পন্ন করতে না পারে বা বাধাগ্রস্ত হয় তখন তাকে বলে প্রজনন-বাধা। এটা অনেকটা জীন প্রবাহের [২.৩.৩ দ্রষ্টব্য] উল্টো। দুটো পপুলেশন যদি নদী-পাহাড়-সমুদ্র-জঙ্গল ইত্যাদি কারণে পরস্পরের সাথে মিশতে না পারে তবে বলা হয় তাদের মধ্যে প্রজনন-বাধাটি ভৌগলিক। গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের ফিঞ্চ পাখিরা [২.৩.২ দ্রষ্টব্য]  ভৌগলিক কারণে প্রজনন-বাধার সম্মুখীন। একসময় হয়তো তারা ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে পরিণত হবে। কিন্তু প্রজনন-বাধার কারণ সবসময় ভৌগলিক হবে এমন কোনো কথা নেই। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে সেখানে বেশ কিছু নতুন উদ্ভিদ প্রজাতির উৎপত্তি হয়েছিল। দেখা গেল, নতুন স্থাপিত কল-কারখানার আশেপাশে কয়েক দশকের মধ্যে নতুন নতুন প্রজাতির উদ্ভিদের আবির্ভাব ঘটছে। ঘটনা কী? কারখানা বসানোর আগে ঐ জায়গায় খোলা ময়দান ছিল। ময়দানে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ হাজার বছর ধরে সুখে-শান্তিতে বাস করছিল। একই ময়দানে বসবাসকারী ঐসব উদ্ভিদের মধ্যে একই প্রজাতির উদ্ভিদগুলো নিয়ে এক একটি পপুলেশন গঠিত। এরকম একটি পপুলেশনে সব সদস্যের একই সময়ে ফুল ধরে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে এই বৈশিষ্ট্যটি নির্বাচিত হয়েছে কারণ যাদের ফুল র‌্যান্ডম সময়ে ফোটে তারা পরাগায়ন করতে পারেনি, তাদের বংশরক্ষাও হয়নি। মাঝখানে হঠাৎ একটা কারখানা বসানোতে বর্জ্যের প্রভাবে কারখানার আশেপাশে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত মাটির রাসায়নিক গঠন বদলে গেল। এর ফলে ঐ দূরত্বের মধ্যে আলোচ্য পপুলেশনের যতগুলো সদস্য বাস করতো তাদের ফুল ধরার সময় গেল পাল্টে। পপুলেশনের বাকি সদস্যদের সাথে তাদের ফুল ধরার সময় আর মিললো না। অর্থাৎ কোনো ভৌগলিক বাধা না থাকা সত্ত্বেও পপুলেশনের একটি অংশ অপর অংশের সাথে পরাগায়ন তথা প্রজনন করতে পারছে না। কারণ তাদেরকে সময় দিয়ে আলাদা করে রাখা হয়েছে, স্থান দিয়ে নয়। এখন পপুলেশনের আলাদা হয়ে পড়া অংশটির সদস্যদের নিজেদের মধ্য ফুল ধরার সময় মিলতে পারে, নাও মিলতে পারে। যদি না মেলে তবে কিছু প্রজন্ম পরে দেখা যাবে কারখানার আশেপাশের এলাকায় ঐ প্রজাতির উদ্ভিদ আর নেই। বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবশ্য একে ঠিক বিলুপ্তি বলা যায় না কারণ কারখানা থেকে পর্যাপ্ত দূরত্বে গেলে ঐ প্রজাতির উদ্ভিদ তো ঠিকই মিলবে। শুধু কারখানার কাছাকাছি তাদের আর পাওয়া যাবে না। আবার যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা উদ্ভিদগুলোর নিজেদের মধ্যে পরাগায়নের সময় মিলে যায় তখন বেশ কিছু প্রজন্ম বাদে দেখা যাবে যে তারা পাল্টে গেছে। বাহ্যিকভাবে খুব বেশি পরিবর্তন না-ও হতে পারে। তুমি দেখলে হয়তো বলবে কারখানার কাছের আর দূরের উদ্ভিদ তো একই রকম আছে! কিন্তু দুটি দলের মধ্যে কৃত্রিমভাবে পরাগায়নের [২.২.১ দ্রষ্টব্য] চেষ্টা করে দেখো। কোনো ফল (উভয় অর্থে) হবে না। অর্থাৎ তারা এখন ভিন্ন দুটি প্রজাতি। একই ভৌগলিক সীমানার মধ্যে থেকেও যেহেতু তারা পরিবেশের ভিন্ন নিয়ামকের (কারখানার বর্জ্য) সম্মুখীন হয়েছে, মূল পপুলেশনের থেকে পৃথকভাবে প্রজনন করেছে এবং মূল পপুলেশন থেকে ছোট বা কম সদস্যবিশিষ্ট হওয়ায় অধিক জীন বিন্যাস [২.৩.৪ দ্রষ্টব্য] ঘটার সুযোগ পেয়েছে, সেহেতু নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটতে পেরেছে।

এ প্রসঙ্গে কিছু জিনিস খেয়াল করো:

১) বিবর্তন যে সবসময় ধীরগতিতে হয় (gradualism) তা নয়, পরিবেশের নির্বাচনকারী নিয়ামক যদি শক্তিশালী হয় তবে বিবর্তনের ফল বেশ দ্রুত পাওয়া যায়।

২) আরশোলা, ডাইনোসরের আমল থেকে এখন পর্যন্ত কমবেশি একইরকম আছে কারণ তারা এমন কিছু বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে যেগুলো পরিবেশের সহস্র ধরণের নিয়ামকের সাপেক্ষে নিরপেক্ষ থাকতে পারে।

৩) ডিম আগে না মুরগী আগে? অবশ্য একটা মুরগী দিয়ে যেহেতু সমগ্র মুরগী পপুলেশনের সূচনা চিহ্নিত করা যায় না এবং বিবর্তন এরকম সরলরেখায় ঘটেনি, সেহেতু এই প্রশ্নটিই অবান্তর। তবু যদি উত্তর একটা দিতেই হয় তাহলে বলতে হবে মুরগীই আগে। কারণ প্রথম মুরগীটি যে ডিম থেকে বেরিয়েছিল সেটা নিশ্চয়ই মুরগীর ডিম ছিল না, ছিল মুরগীর পূর্বপুরুষের ডিম।

৪) মানুষ নিজেই তার পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এমন মানুষকে বাঁচিয়ে রেখে বংশধর আনার সুযোগ করে দিচ্ছে যার ঐ বয়স পর্যন্ত টেকারই কথা নয়, ফলে পপুলেশনে মন্দ অ্যালীল ঢুকে যাচ্ছে। আবার যুদ্ধের নামে অনেক উন্নত (পরিবেশের সাথে লড়াই করে বাঁচার উপযুক্ত) বৈশিষ্ট্য-ওয়ালা মানুষ তাদের জীনসহ আমাদের পপুলেশন থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে, ফলে আমরা ভালো ভালো অ্যালীল হারাচ্ছি। এসব কারণে বিভিন্ন অ্যালীলের উপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের বিশেষ কোনো কর্তৃত্ব থাকছে না। তাই মানুষ বিবর্তিত হচ্ছে না।

৫) ভিন্ন ধর্মের বা জাতির মানুষেরা সাধারণত বিয়ে করে না। তাহলে এই প্রজনন-বাধার কারণে ঐ জাতিগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে পরিণত হওয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। কারণ এই জাতপাতের বাধা মানুষ বেশিদিন আগে সৃষ্টি করেনি এবং বাধাগুলো প্রায়ই ভাঙা হয়, গোচরে বা অগোচরে। তাই আমরা সবাই এখনো একটা প্রজাতিই আছি। ভাগ্যিস এসব রীতিনীতি প্রায়ই অমান্য করা হয়!

নিরবিক ডট কম একটি প্রশ্ন উত্তর সাইট। এটি এমন একটি প্লাটফরম যেখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।আর আপনি যদি সবজান্তা হয়ে থাকেন তাহলে অন্যের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন।
...