নিরভিকে ডট কমে আপনাকে স্বাগতম।এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।প্রশ্ন করতে Ask a Question ক্লিক করুন।
28 views
asked in বিজ্ঞান by (1,625 points)
closed by
closed with the note: only admin can answere this

1 Answer

0 like 0 dislike
answered by (1,625 points)
 
Best answer

ডারউইনীয় বনাম অ-ডারউইনীয় বিবর্তন

নিয়ম-মাফিক এন্টিবায়োটিকের কোর্স পূর্ণ না করলে কী হয়? রোগসৃষ্টিকারী ব্যাক্টেরিয়া পপুলেশনের অন্তত কিছু সদস্য বেঁচে থাকার ও বংশবৃদ্ধি করার সুযোগ পায়। সুযোগটা বরং বেশ ভালোমতোই পায়। কারণ এন্টিবায়োটিক যেহেতু পপুলেশনের অধিকাংশ সদস্যকেই মেরে ফেলেছে সেহেতু কম প্রতিযোগিতাতেই তাদের টিকে থাকা সম্ভব হয়। ঐ টিকে থাকা গুটিকয় ব্যাক্টেরিয়া হয়তো স্রেফ সংখ্যা কম থাকার জন্য তখনই রোগলক্ষণ প্রকাশ করতে পারে না, কিন্তু যদি কোনোমতে সংখ্যাটা বাড়িয়ে ফেলে তাহলেই সমূহ বিপদ। আগের এন্টিবায়োটিক আর ভালো কাজ করবে না। এই বিবর্তিত ব্যাক্টেরিয়াগুলো নিয়ে আরো এক রকম বিপদ আছে। ধরা যাক, টিংকু মিয়া এন্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পূর্ণ না করায় তার শরীরে ব্যাক্টেরিয়ার একটি পপুলেশন একটি বিশেষ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠলো। তারপর টিংকু মিয়ার ভাই রিংকু মিয়ার শরীরে ঐ ব্যাক্টেরিয়াগুলো সংক্রমিত হলো। রিংকু মিয়া কিন্তু আজীবন ভালো ছেলের মতো সমস্ত এন্টিবায়োটিকের কোর্স পূর্ণ করেছে। তবু এইবার সেই একই এন্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না, কারণ ব্যাক্টেরিয়াগুলো রিংকু মিয়ার শরীরে ঢোকার আগে থেকেই প্রতিরোধী। অর্থাৎ টিংকু মিয়ার ‘পাপের ফল’ রিংকু মিয়া ভোগ করবে। এন্টিবায়োটিক গ্রহণে অনিয়ম করাটা তাই নিজের জন্য ক্ষতিকর তো বটেই, সমাজের জন্যও ক্ষতিকর।

২.৩.৩ তে আলোচিত উদাহরণটি লক্ষ্য করলে ডারউইনীয় বিবর্তনের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আমাদের নজরে আসবে:

১) বৈচিত্র্য থাকে জীনে, কিন্তু একটা জীন আলাদা করে নির্বাচিত হতে পারে না। নির্বাচিত হয় ব্যক্তি বা ঐ জীনের বাহক জীব। কিন্তু একটি জীবের এক জনমে যেহেতু তার জীনের কোনো পরিবর্তন ঘটে না সেহেতু সে নির্বাচিত হয়েই খালাস, নির্বাচিত বৈশিষ্ট্যবাহী জীনকে পরের প্রজন্মে পাচার করা পর্যন্ত তার দৌড় সীমাবদ্ধ। বিবর্তন ঘটে পপুলেশনে, ব্যক্তিতে নয়। অর্থাৎ বৈচিত্র্য, নির্বাচন ও বিবর্তন - এই তিনটি জীববৈজ্ঞানিক ঘটনা তিনটি পৃথক সাংগঠনিক স্তরে [১.২.২ দ্রষ্টব্য] ঘটে; যথাক্রমে জীন, ব্যক্তি (পপুলেশনের একজন সদস্য) ও সমগ্র পপুলেশনে।

২) বৈচিত্র্য ব্যাপারটা র‌্যান্ডম, যাদৃচ্ছিক, অনেকটা যা-খুশি-তাই বা বলা যায় দূর্ঘটনার সমাহার। কিন্তু নির্বাচন ব্যাপারটি সুনির্দিষ্ট। পরিবেশের নিয়ামক জানা থাকলে আগে থেকেই বলা যায় কোন ধরণের বৈশিষ্ট্যওয়ালা জীন পরের প্রজন্মে বাড়বে, কোনগুলো কমবে আর কোনগুলো অপরিবর্তিত থাকবে। তাই বৈচিত্র্যকে দূর্ঘটনার সমাহার বলা হলেও সামগ্রিকভাবে বিবর্তন দূর্ঘটনার ফল নয়। কেননা নির্বাচন না হয়ে বিবর্তন হয় না। দোকানে অনেক সাইজের জুতা থাকাটা যদি বৈচিত্র্য হয় তবে সেগুলোর কোনোটা তোমার পায়ে খুব ভালো ফিট হওয়াটা হলো নির্বাচন। তোমার পায়ের সাইজ জানা থাকলে কোন জুতা পায়ে লাগবে সেটা আগেই বলা সম্ভব তবে দোকানে সেই সাইজ আছে কীনা তা দোকানে না গিয়ে বলা মুশকিল। অবশ্য দোকানটা যদি বড় হয় এবং অনেক বিচিত্র সংগ্রহ তাদের থাকে তাহলে তোমার সাইজের জুতা পাওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চয়ই বাড়বে। প্রকৃতি এরকম একটি বড় দোকান।

(৩) প্রতি প্রজন্মে নির্বাচিত বৈশিষ্ট্যগুলো জীন পুলে একটু একটু করে জমতে থাকে। একে বলে cumulative selection। অনেক প্রজন্ম ধরে জমতে থাকা এই ছোট ছোট পরিবর্তন (micro-evolution) একসময় বড়সড় পরিবর্তন (macro-evolution) হয়ে দেখা দিতে পারে। যেমন: এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য জমতে জমতে একসময় ব্যাক্টেরিয়ার পুরো পপুলেশনটাই একটা নতুন প্রজাতিতে পাল্টে যেতে পারে।

এখন পর্যন্ত ডারউইনীয় বিবর্তন বা প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে কথা হলো। প্রকৃতিতে এমন পপুলেশন নেই বা খুব কমই আছে যেখানে এর তিনটি শর্তের [২.৩.৩ দ্রষ্টব্য] অন্তত একটি অনুপস্থিত। তাই এমন পপুলেশন বাস্তবে খুঁজে পাওয়া খুবই দুরূহ যেখানে ডারউইনীয় বিবর্তন চলছে না। তারপরও বিবর্তনের এমন কিছু প্রক্রিয়া সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে যেগুলো ডারউইনীয় বিবর্তনের নিয়মের বাইরে। এপর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত অনুসারে এইসব অ-ডারউইনীয় বিবর্তন প্রক্রিয়ার চেয়ে ডারউইনীয় প্রক্রিয়া হাজারগুণ শক্তিশালী, তবু অ-ডারউইনীয় প্রক্রিয়াও ক্ষেত্রবিশেষে গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্লিডীয় জ্যামিতি যেমন অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির বিশেষ ক্ষেত্র (special case), কিংবা বিশেষ আপেক্ষিকতাকে সাধারণীকরণ (generalization) করে [১.৫.১ দ্রষ্টব্য] যেমন সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, একই ভাবে মেন্ডেলীয় জীনতত্ত্ব থেকে এলো অ-মেন্ডেলীয় জীনতত্ত্ব [২.২.৩ দ্রষ্টব্য] এবং বিবর্তনের ডারউইনীয় ব্যাখ্যার সম্প্রসারণ করে পাওয়া গেল অ-ডারউইনীয় বিবর্তন (non-Darwinian evolution)।

সাধারণভাবে বললে, নির্বাচন ছাড়াই বা নির্বাচন-নিরপেক্ষ ভাবে যে বিবর্তন হয় সেটাকে বলে অ-ডারউইনীয় বিবর্তন। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচন ছাড়া বিবর্তন সম্ভব নয়, অর্থাৎ ডারউইনীয় বিবর্তনই হলো বিবর্তনের প্রধান উপায়, তবু অনেক সময় নির্বাচনকে বাদ দিয়েই বিবর্তন হতে পারে। ডারউইনীয় বিবর্তনের মূলনীতি [২.৩.৩ দ্রষ্টব্য] মনে করে দেখো। সেখানে বলা হয়েছে, বৈচিত্র্য, নির্বাচন এবং বংশগতি থাকলে অবশ্যই বিবর্তন ঘটবে। এটা কিন্তু বলা হয়নি যে, তার উল্টোটাও সত্যি। বিবর্তন ঘটলে তার পিছনে ঐ তিনটিকে অবশ্যই থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। ২.৩.৩ এ বিবর্তনের গাণিতিক প্রকাশের বেলায় আমরা এজন্যই ‘=’ (is equal to) না লিখে ‘⊂’ (subset of) লিখেছি। অ-ডারউইনীয় বিবর্তন তিনভাবে হতে পারে: পরিব্যক্তি (mutation) [২.২.৪ দ্রষ্টব্য], জীন বিন্যাস (genetic drift) অথবা জীন প্রবাহ (gene flow)। তুলনার জন্য এখন ডারউইনীয় ও অ-ডারউইনীয় বিবর্তনের নানা স¤পর্ক গণিতের ভাষায় প্রকাশ করছি:

(variation) ∩ (selection) ∩ (heredity) = (Darwinian evolution);

(mutation) ∪ (genetic drift) ∪ (gene flow) = (non-Darwinian evolution);

(Darwinian evolution) ∪ (non-Darwinian evolution) = (evolution).

উল্লেখ্য, কোনো পপুলেশনে ডারউইনীয় ও অ-ডারউইনীয় বিবর্তন একই সাথে চলতে পারে এবং অধিকাংশ পপুলেশনে চলেও তাই।

পরিব্যক্তি: ডারউইনীয় বিবর্তনের জন্য পপুলেশনে যে বৈচিত্র্য থাকা দরকার তার অন্যতম প্রধান উৎস পরিব্যক্তি (এই বৈচিত্র্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস বা কারণ হলো মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্র [২.২.২ দ্রষ্টব্য])। নির্বাচন ছাড়া শুধু পরিব্যক্তির পক্ষে বিবর্তন ঘটানোর সম্ভাবনা বেশ কম হলেও তা একেবারে শূণ্য নয়। তাই অ-ডারউইনীয় বিবর্তনের একটি সম্ভব্য কারণ হিসেবে পরিব্যক্তিকে বিবেচনা করা হয়েছে। তাহলে বলা যায়:

(mutation) ⊂  (variation);

(Darwinian evolution) ∩ (non-Darwinian evolution) = (mutation).

পরিব্যক্তি বিবর্তন প্রক্রিয়ার জ্বালানী হিসেবে কাজ করে। উভয় প্রকার বিবর্তনের জন্যেই এই জ্বালানী প্রয়োজন।

জীন বিন্যাস: নিরপেক্ষ [২.৩.৩ দ্রষ্টব্য] বৈশিষ্ট্যগুলো নির্বাচনের উপর নির্ভরশীল নয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যবাহী জীনগুলোর অ্যালীল ফ্রিকোয়েন্সি [২.৩.২ দ্রষ্টব্য] র‌্যান্ডমভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন ধরো মানুষের নাক কারো বোঁচা কারো চোখা, কিন্তু নাকের উচ্চতার এক-দুই মিলিমিটার কমবেশির জন্য টিকে থাকার ব্যাপারে কোনো সুবিধা বা অসুবিধা হয় না। তারপরও যদি বিভিন্ন প্রজন্মে এই বৈশিষ্ট্যের পরিমাণ বা ফ্রিকোয়েন্সি হিসাব করো তবে দেখবে একেক প্রজন্মে একেক রকম মান পাচ্ছো। এর নাম জীন বিন্যাস। অবশ্য সব নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য যে জীন বিন্যাসের আওতায় আসবে এমন কোনো কথা নেই। জীন বিন্যাসের কারণে যে বিবর্তন হয় তা কেবল নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যবাহী জীন নিয়ে কাজ করে বলে তাকে অনেক সময় নিরপেক্ষ বিবর্তন (neutral evolution) বলা হয়। ছোট পপুলেশনে নিরপেক্ষ বিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

জীন প্রবাহ: এক পপুলেশনের কিছু সদস্য যদি আরেক পপুলেশনে চলে আসে এবং উভয় পপুলেশন যদি একই প্রজাতির বা কাছাকাছি প্রজাতির হওয়ায় নিজেদের মধ্যে মিলন বা জীন আদান-প্রদান করতে সক্ষম হয় তবে দেখা যাবে পপুলেশনের অ্যালীল ফ্রিকোয়েন্সি পাল্টে যাচ্ছে। এটাই জীন প্রবাহ। এর অপর নাম পরিযান (migration)। পরিযায়ী ‘অতিথি’ পাখির কোনো পপুলেশন বহু হাজার মাইল পেরিয়ে একই প্রজাতির অপর একটি পপুলেশনে মিশে যাওয়ার ঘটনা আমরা বাংলাদেশে প্রতি শীতেই দেখে থাকি। জীন প্রবাহের ফলেই বেশ কিছু মিশ্র মানবগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে। যেমন: আফ্রিকান-আমেরিকান। অত দূরে যাই কেন! আমরা অর্থাৎ ভারতীয় উপমহাদেশের অধিবাসীরাই তো নানামুখী বিচিত্র জীন প্রবাহের জীবন্ত উদাহরণ। প্রতিবার বিদেশী কোনো রাজবংশ আমাদের জয় করেছে আর সেই সাথে আমাদের পপুলেশনে প্রবাহিত হয়েছে তাদের পপুলেশনের জীন। একটা সময় ‘আমাদের’-‘তাদের’ কথাগুলো অর্থহীন হয়ে সবই আমাদের জীন হয়ে গেছে। তাইতো আমাদের জাতির মানুষগুলো পৃথিবীর অন্য যেকোনো জাতির চেয়ে এত বেশি বৈচিত্র্যময়।

নিরবিক ডট কম একটি প্রশ্ন উত্তর সাইট। এটি এমন একটি প্লাটফরম যেখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।আর আপনি যদি সবজান্তা হয়ে থাকেন তাহলে অন্যের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন।
...