নিরভিকে ডট কমে আপনাকে স্বাগতম।এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।প্রশ্ন করতে Ask a Question ক্লিক করুন।
2 like 0 dislike
22 views
asked in বিজ্ঞান by (1,626 points)
closed by
closed with the note: only admin can answere this

1 Answer

0 like 0 dislike
answered by (1,626 points)

মেন্ডেলের দুটি সূত্র

মেন্ডেলের সূত্রদুটো বলার আগে দুটো কথার মানে জেনে নিই - জীন এবং অ্যালীল। জীন হলো এক একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য নির্ধারিত এক একটি ‘জিনিস’। এই জিনিসটা কঠিন না তরল না বায়বীয়, খায় নাকি মাথায় দেয় - সেটা নিয়ে মেন্ডেল মাথা ঘামাননি। কারণ, প্রথমত তাঁর তত্ত্বের জন্য সেটার কোনো দরকার ছিল না এবং দ্বিতীয়ত পাদ্রী হওয়াতে ওরকম ব্যাখ্যার অতীত আশ্চর্য সত্ত্বায় বিশ্বাস রাখতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। ঈশ্বর কী দিয়ে গঠিত - এই প্রশ্নটির মতো জীন কী দিয়ে গঠিত - এই প্রশ্নটিও মেন্ডেলের কাছে অবান্তর ছিল। (পরে অবশ্য আমরা সেটা বের করে ফেলেছি, তার কথা নাহয় পরেই হবে) এক একটি জীনের দুইটি রকমফের থাকে, যা ঐ বৈশিষ্ট্যের দুটো বিশুদ্ধ জাত নির্দেশ করে। ঐ দুটোর প্রতিটিই হলো ঐ জীনের এক একটি অ্যালীল। যেমন: উচ্চতার জন্য যে জীন থাকে তার অ্যালীল দুটি - লম্বার অ্যালীল এবং খাটোর অ্যালীল। মসৃণতার জীনেরও অনুরূপভাবে দুটি অ্যালীল - মসৃণ ও অমসৃণ।

মেন্ডেলের প্রথম সূত্র : কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য একটি জীনের দুটি প্রকারভেদ বা অ্যালীল জীবের মধ্যে থাকে এবং একটি অ্যালীল অপরটির সাথে মিশে যায় না বা একটির প্রভাবে অপরটি পরিবর্তিত হয় না, বরং উভয়ই তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখে। সন্তান উৎপাদনের সময় জীবের কোনো বৈশিষ্ট্য প্রকাশক অ্যালীলজোড়ের যেকোনো একটি বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে আসে। জোড়া থেকে কোন অ্যালীলটি আসবে তার কোনো ঠিক নেই। একটি কয়েন টস করলে যেমন তার হেড ও টেইল পড়ার সম্ভাবনা সমান তেমনি একটি বিশেষ জীনের অ্যালীলজোড় থেকে উভয় অ্যালীলের সন্তানে আসার সম্ভাবনা সমান। এভাবে মা ও বাবা প্রত্যেকের থেকে প্রতিটি জীনের একটি করে অ্যালীল এসে সন্তানের দেহে জোড়া বেঁধে একই উপায়ে একটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। এই সূত্রকে বলে Law of segregation.

মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্র : একটি জীনের কোনো একটি অ্যালীল সন্তানে আসা না-আসার সাথে অন্য একটি জীনের কোনো অ্যালীল আসা না-আসার কোনো স¤পর্ক নেই। অন্যভাবে বললে কোনো অ্যালীল সন্তানে আসার ব্যাপারে একটি জীন অপর একটি জীনকে প্রভাবিত করে না। একবার কয়েন টস করলে হেড না টেইল পড়লো তা থেকে যেমন পরেরবার কয়েন টসে হেড না টেইল পড়বে সেটা নির্ধারণ করা যায় না, তেমনি একটি জীনের কোনো একটি অ্যালীল সন্তানে আসা না-আসা এবং অপর একটি জীনের কোনো একটি অ্যালীল সন্তানে আসা না-আসা - এই দুটি ঘটনা পরপর স্বাধীনভাবে ঘটে। এই সূত্রকে বলে Law of independent assortment.

এখন দেখা যাক এই সূত্রদুটোকে সত্যি বলে ধরে নিয়ে আসলেই মেন্ডেলের কোনো লাভ হল কীনা। বিশুদ্ধ লম্বার অ্যালীলকে সংক্ষেপে T দিয়ে এবং বিশুদ্ধ খাটোর অ্যালীলকে সংক্ষেপে t দিয়ে প্রকাশ করি। মেন্ডেলের প্রথম সূত্র মতে যেকোনো জাতের বৈশিষ্ট্যের জন্য এরকম একজোড়া অ্যালীল থাকে। বিশুদ্ধ লম্বা জাতের বেলায় উচ্চতার জীনের দুটো অ্যালীলই T হবে। অর্থাৎ বিশুদ্ধ লম্বা জাতের অ্যালীল জোড়টি হল  TT. একইভাবে বিশুদ্ধ খাটো জাতের অ্যালীল জোড়টি হবে tt. বিশুদ্ধ লম্বা বাবা ও বিশুদ্ধ লম্বা মা এর বাচ্চার মধ্যে বাবার TT হতে যেকোনো একটি T এবং মায়ের TT হতে যেকোনো একটি T এসে দুয়ে মিলে TT অ্যালীলজোড় গঠন করবে, যা তার বাবা বা মায়ের অনুরূপ। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মেন্ডেলের সূত্র হতে আমরা প্রমাণ করতে পারছি যে বিশুদ্ধ লম্বা বাবা-মায়ের সন্তান সবসময় বিশুদ্ধ লম্বা হবে। এই সিদ্ধান্ত আমাদের পর্যবেক্ষণের সারে মিলে যায়। একইভাবে বিশুদ্ধ খাটো বাবা-মায়ের সন্তান যে সবসময় বিশুদ্ধ খাটোই হবে সেটা দেখানো যায়। এটাও আমাদের পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করে। বিশুদ্ধ খাটো (tt) বাবা এবং বিশুদ্ধ লম্বা (TT) মায়ের সন্তানের বেলায় কী হবে? মেন্ডেলের প্রথম সূত্র মতে বাবার tt হতে যেকোনো একটি t এবং মায়ের  TT হতে যেকোনো একটি  T এসে দুয়ে মিলে Tt অ্যালীলজোড় গঠন করবে। কিন্তু প্রথম সূত্র মতে আমরা আরো জানি অ্যালীলজোড়ের একটি অ্যালীল অপরটির সাথে মিশে যায় না বা একটির প্রভাবে অপরটি পরিবর্তিত হয় না, বরং উভয়ই তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখে। তাই বিশুদ্ধ লম্বা T এবং বিশুদ্ধ খাটো t মিলে মাঝারি উচ্চতার হয়ে যাচ্ছে না। T তার স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখছে গাছটাকে লম্বা করে দেওয়ার মাধ্যমে এবং t সেই কাজে কোনো বাগড়া না বাধিয়ে আপন মনে নিশ্চুপ হয়ে থাকছে। দুটি অ্যালীল যদি ভিন্ন হয় তাহলে তাদের মধ্যে যেটির বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় তাকে ঐ জীনের প্রকট (dominant) অ্যালীল বলে অবং যেটি চুপচাপ থাকে সেটিকে প্রচ্ছন্ন (recessive) অ্যালীল বলে। এখানে T প্রকট এবং t প্রচ্ছন্ন।

বাইরে থেকে দেখে বিশুদ্ধ লম্বা (TT) এবং সঙ্কর লম্বার (Tt) মধ্যে ফারাক করা যায় না। লম্বা হওয়াটা এখানে ‘ফেনোটাইপ’ আর TT এবং Tt হলো দুটি ‘জেনোটাইপ’। অর্থাৎ একই ফেনোটাইপের অন্তরালে একাধিক জেনোটাইপ থাকতে পারে। যে জেনোটাইপের দুটো অ্যালীল একই তাকে বলে ‘হোমোজাইগাস’ বা বিশুদ্ধ এবং যার দুটি অ্যালীল ভিন্ন তাকে বলে ‘হেটারোজাইগাস’ বা সঙ্কর। এখানে TT ও tt উভয়ই হোমোজাইগাস আর Tt হেটারোজাইগাস। লক্ষ্য কর, বিশুদ্ধ খাটো (tt) বাবা এবং বিশুদ্ধ লম্বা (TT) মায়ের সন্তান আর বিশুদ্ধ খাটো (tt) মা এবং বিশুদ্ধ লম্বা (TT) বাবার সন্তানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। উভয় ক্ষেত্রেই তা Tt হবে। এটাও আমরা পর্যবেক্ষণে পেয়েছি।

সঙ্কর বা হেটারোজাইগাস লম্বা (Tt) বাবা-মায়ের সন্তান কেমন হবে? সেক্ষেত্রে প্রথম সূত্র মতে বাবার Tt থেকে T অথবা t আসবে এবং মায়েরও Tt থেকে T অথবা t আসবে। সুতরাং সম্ভব্য অ্যালীলজোড় বা জেনোটাইপ গুলো হবে TT, Tt, tT, tt. এখানে Tt এবং tT আসলে একই জেনোটাইপ। এটা কি মেন্ডেলের সেই লম্বা:খাটো = ৩:১ এর সাথে মেলে? ফেনোটাইপ কিন্তু তাই বলে।

এতোক্ষণ শুধু একটা জীন নিয়ে হিসাব করা হলো। দুটো জীন নিয়ে একসাথে হিসাব করলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে? মেন্ডেল মটরশুঁটির দানার দুটো বৈশিষ্ট্য নিয়ে একসাথে কাজ করেছেন - মসৃণতা আর রং। মসৃণতার অ্যালীল দুটি হলো মসৃণ ও অমসৃণ এবং রঙের অ্যালীল দুটি হলো হলুদ ও সবুজ। বিশুদ্ধ মসৃণ-হলুদ জাতের সাথে বিশুদ্ধ অমসৃণ-সবুজ জাতের পরাগায়ন ঘটালে সন্তানদের মধ্যে সম্ভব্য যে চার ধরণের ফেনোটাইপ পাওয়ার কথা সেগুলো হলো মসৃণ-হলুদ, মসৃণ-সবুজ, অমসৃণ-হলুদ এবং অমসৃণ-সবুজ। বাস্তবেও তাই পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হলো, কোন ফেনোটাইপ কী অনুপাতে পাওয়া যায়? যদি মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্র সত্যি হয় তাহলে বাবা-মায়ের থেকে মসৃণতার কোন অ্যালীল সন্তান পেল সেটা, আর রঙের কোন অ্যালীল সন্তান পেল সেটা - একে অপরের উপর নির্ভর করবে না। তখন গাণিতিক হিসাবে চার ধরণের ফেনোটাইপের অনুপাত আসা উচিত ৯:৩:৩:১. কার ভাগে ৯ পড়বে, কার ভাগে ১ পড়বে আর কার কার ভাগে ৩ পড়বে, সেটা নির্ভর করবে কোন অ্যালীল প্রকট আর কোনটা প্রচ্ছন্ন তার উপর। মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্র সঠিক হওয়ার জন্য অনুপাতের বন্টন এমন হওয়া উচিত, যাতে প্রকট-প্রকট : প্রকট-প্রচ্ছন্ন : প্রচ্ছন্ন-প্রকট : প্রচ্ছন্ন-প্রচ্ছন্ন = ৯:৩:৩:১ হয়। মেন্ডেল তাঁর মটরশুঁটি বাগানে গিয়ে বিশুদ্ধ মসৃণ-হলুদ এবং বিশুদ্ধ অমসৃণ-সবুজ এর হাজারখানেক বাচ্চার মটরদানাগুলো কার কেমন তা গুনে দেখলেন, ঘটনা ঠিক তাই। মসৃণ-হলুদ : মসৃণ-সবুজ : অমসৃণ-হলুদ : অমসৃণ-সবুজ = ৯:৩:৩:১. এ থেকে আরো বোঝা গেল মসৃণতার অ্যালীলদুটির মধ্যে মসৃণ হলো প্রকট এবং রঙের অ্যালীলদুটির মধ্যে প্রকট হলো হলুদ। যদি বিশুদ্ধ মসৃণ-হলুদ জাতের সাথে বিশুদ্ধ অমসৃণ-সবুজ জাতের প্রজনন না ঘটিয়ে বরং বিশুদ্ধ অমসৃণ-সবুজ জাতের সাথে সঙ্কর মসৃণ-হলুদ জাতের প্রজনন ঘটানো হয় তাহলে কিন্তু অনুপাতটি হবে ১:১:১:১. এটাও পর্যবেক্ষণের সাথে মেলে।

এভাবে মেন্ডেলের সমস্ত পর্যবেক্ষণকে সুন্দরভাবে এবং সবচেয়ে কম কথায় ব্যাখ্যা করে দেয় তাঁর অমর দুটি সূত্র। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের 3C মানদণ্ড [১.৪.৪ দ্রষ্টব্য] যেন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছে তারা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো আধুনিক জেনেটিক্সের ভিত্তি রচিত হয়েছে এই সূত্রদুটির ব্যতিক্রমগুলোর কারণ উদঘাটন করতে গিয়ে।

নিরবিক ডট কম একটি প্রশ্ন উত্তর সাইট। এটি এমন একটি প্লাটফরম যেখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।আর আপনি যদি সবজান্তা হয়ে থাকেন তাহলে অন্যের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন।