নিরভিকে ডট কমে আপনাকে স্বাগতম।এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।প্রশ্ন করতে Ask a Question ক্লিক করুন।
2 like 0 dislike
19 views
asked in বিজ্ঞান by (1,626 points)
closed by
closed with the note: only admin can answere this

1 Answer

0 like 0 dislike
answered by (1,626 points)
 
Best answer

কোষতাত্ত্বিক স্বীকার্য ও তার ইতিহাস

১.৩.১ এ আমরা কোষতাত্ত্বিক স্বীকার্য জেনেছিলাম। সেটা আরেকবার মনে করি:

“কোষ হলো জীবনের মৌলিক একক।”

আমরা স্কুল-কলেজে কোষের যে সংজ্ঞাটা পড়েছি সেটা আসলে এই কোষতাত্ত্বিক স্বীকার্যটাই একটু ঘুরিয়ে বলা - জীবের গঠন ও কার্যের মৌলিক একককে কোষ বলে। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে এই কথাটার মাথামুণ্ডু কোনো মানেই হয়না যদি ‘মৌলিক একক’ বলতে কী বোঝায় সেটা জানা না থাকে। তখন একটা বৃত্তের মধ্যে কথাটা কেবল ঘুরপাক খায়: ‘কোষ কী? জীবনের মৌলিক একক। জীবনের মৌলিক একককে কী বলে? কোষ।’ কথার এরকম চক্রাকারে ঘুরতে থাকাকে বলে ‘বৃত্তাকার যুক্তি’ (circular reasoning)। এটা আসলে কোনো যুক্তিই নয়, বরং যুক্তির মুখোশধারী কুযুক্তি [১.৪.৪ দ্রষ্টব্য]। হার্বার্ট স্পেন্সারের আবিষ্কৃত কিন্তু ডারউইনের নামে চালিয়ে দেওয়া সেই জনপ্রিয় উক্তি ‘সার্ভাইভ্যাল অব দ্যা ফিটেস্ট’ -টাও [১.৭.৩ দ্রষ্টব্য] বৃত্তাকার যুক্তির একটা চমৎকার উদাহরণ, সেটা নিয়ে যথাসময়ে কথা হবে। এখন প্রশ্ন হলো, কোষতাত্ত্বিক স্বীকার্যকে ঐ দুষ্টচক্র হতে মুক্ত করা যাবে কীভাবে? উপায় একটাই, ‘মৌলিক একক’ কথাটার এমন এক সংজ্ঞা দিতে হবে যা আলোচ্য স্বীকার্যের কোনো অংশের উপর নির্ভরশীল না হয় [১.৪.৪ দ্রষ্টব্য]।

যৌগের মৌলিক একক হলো অণু। মৌলের মৌলিক একক হলো পরমাণু। এই কথাগুলোর সাথে আমরা পরিচিত। এখানে ‘মৌলিক একক’ বলতে কী বোঝাচ্ছে? কার্বন ডাই অক্সাইড একটি যৌগ। এক সিলিন্ডার কার্বন ডাই অক্সাইডের রাসায়নিক ধর্ম যা, একটি কার্বন ডাই অক্সাইড অণুর রাসায়নিক ধর্মও তাই। তবে ঐ অণুকে আরো যদি ভাঙা হয় তবে তা কার্বন ও অক্সিজেন পরমাণুতে বিভক্ত হয়ে যাবে, যাদের কারো রাসায়নিক ধর্ম কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো নয়। কেননা তখন সাংগঠনিক স্তর [১.২.২ দ্রষ্টব্য] পাল্টে যায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, কার্বন ডাই অক্সাইডের রাসায়নিক ধর্ম তার অণু পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকে। যেকোনো যৌগের জন্যই কথাটা সত্যি। তাই অণুকে যৌগের মৌলিক একক বলা হচ্ছে। কখনও কখনও মৌলিক একক না বলে ক্ষুদ্রতম একক কথাটা ব্যবহার করা হয়। হ্যাঁ, সেদিক দিয়েও কথাটা সত্যি। আবার মৌলের বেলায় পরমাণু পর্যন্ত রাসায়নিক ধর্মটা একইরকম থাকে, তবে আরো ভাঙলে ইলেক্ট্রন-প্রোটন-নিউট্রনে ভাগ হয়ে সাংগঠনিক স্তর পাল্টে যায়। অক্সিজেনের পরমাণু ভেঙে পাওয়া নিউট্রন আর সীসার পরমাণু ভেঙে পাওয়া নিউট্রন সব দিক দিয়ে একই রকম। এটা কখনোই বলা সম্ভব না যে কোন নিউট্রন কোন পরমাণু থেকে এসেছে। ঠিক যেন, কালো আর ধলো বাহিরে কেবল, ভেতরে সবারি সমান রাঙা! পরমাণু থেকে নিচের স্তরে নামলে মৌলের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য সবটাই হারিয়ে যায় বলে পরমাণুকে বলে মৌলের মৌলিক ও ক্ষুদ্রতম একক। তবে এখানে একটা কথা আছে। এক সিলিন্ডার কার্বন ডাই অক্সাইড আর একটি কার্বন ডাই অক্সাইড অণুর মধ্যে কী কোনোই পার্থক্য নেই? হ্যাঁ, রাসায়নিকভাবে তারা একই আচরণ করে। কিন্তু তাদের তাপগতীয় আচরণ কি একইরকম? মোটেই তা নয়। একটা সিলিন্ডারের মধ্যে অসংখ্য কার্বন ডাই অক্সাইড অণুর পাস্পরিক মিথষ্ক্রিয়াটা কখনোই একটিমাত্র অণুর কাছ থেকে আশা করা যায় না। একটিমাত্র অণুর গতির কোনো নিয়ম নেই, সে কখন কোথায় কোনদিকে দৌড় দেবে তা আগে থেকে বলা অসম্ভব। কিন্তু একদল অণুকে পরিসংখ্যানের নিয়মে বেঁধে বর্ণনা করা সম্ভব। সম্ভব তাদের সমষ্টিগত আচরণ সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া। তাই রাসায়নিক ধর্মের দিক থেকে একটি অণু ও একদল অণুর মধ্যে পার্থক্য না থাকলেও তাপগতীয় ধর্মের দিক থেকে পার্থক্য আছে। পরমাণুর জন্যেও একই কথা প্রযোজ্য। রাসায়নিক ও তাপগতীয় ধর্মের মধ্যকার সম্পর্কটা দ্বান্দ্বিক - এটাও বিবেচনায় রাখা চাই।

এখন যদি বলি, কোষ হলো জীবের গঠন ও কার্যের মৌলিক একক, তাহলে কথাটার অর্থ কিছু বোঝা যাচ্ছে? একথার মানে তোমার কাছে আগে যা ছিল আর এখন মানে যা দাঁড়িয়েছে - এদুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাও?

১৬৬৫ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক একটা জোড়াতালি দেওয়া যৌগিক অণুবীক্ষণের নিচে (যেখানে বিবর্ধনের জন্য কমপক্ষে দুটি লেন্স ব্যবহার করা হয়) পাতলা করে কাটা একটুকরো কর্ক (যেটা একটা গাছের অংশ থেকে তৈরী) রেখে দেখতে পেলেন যে সেখানে অনেকগুলো বহুভূজাকার কুঠুরী রয়েছে। ঠিক যেন আশ্রমে সন্ন্যাসীদের থাকার ছোট ছোট খোপের মতো। এরকম খোপকে cell বলা হয়। তাই হুক তাঁর দেখা কুঠুরীগুলোরও ঐ একই নাম দিলেন। আমরা এখনও জীবকোষ বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করি। হুক যেটা দেখেছিলেন সেটা আসলে মৃত উদ্ভিদকলার কঙ্কাল। তাঁর দেখা কুঠুরীগুলোর দেয়ালগুলো সব ছিল কোষপ্রাচীর আর সেই কোষপ্রাচীরে ঘেরা খোপগুলোর মধ্যকার জায়গাগুলো বিলকুল ফাঁকা। উদ্ভিদকলাটা যখন বেঁচে ছিল তখন সেই ফাঁকা জায়গাগুলোতে নিশ্চয়ই জীবিত কোষ ছিল। তাই হুক সত্যিকার অর্থে কোষ দেখেননি, কোষের থাকার জায়গাটা দেখেছেন মাত্র। প্রথম যে ব্যক্তি জীবিত কোষ দেখেছিলেন তিনি হলেন আরেকজন হুক - হল্যান্ডের এন্টনি ভন লিউয়েনহুক। তিনি অবশ্য রবার্ট হুকের কোনো জ্ঞাতি নন! ১৬৭৪ সালে অণুবীণের নিচে পানির মধ্যে এক দঙ্গল এককোষী জীবকে নড়াচড়া করতে দেখে লিউয়েনহুক বড়ই অবাক বনে গিয়েছিলেন। তাঁর দেখা (অর্থাৎ মানুষের দেখা) প্রথম জীবটিকে এখন বিজ্ঞানীরা Giardia intestinalis নামে ডাকেন। প্রোটোজোয়া পর্বের এককোষ ওয়ালা এই জীবটির দুটো নিউক্লিয়াস আছে এবং কোষের আকৃতি অনেকটা ডিমের মতো। সব মিলিয়ে সেটাকে অণুবীক্ষণের নিচে হুতোমপ্যাঁচার মুখের মতো দেখায়। পাশাপাশি থাকা দুটো পেল্লায় নিউক্লিয়াস যেন প্যাঁচার ইয়া বড় বড় দুটো চোখ! এরকম বিভিন্ন এককোষী জীবের সাথে পরিচিত বিভিন্ন প্রাণীর চেহারার সাদৃশ্য দেখে লিউয়েনহুক ভেবেছিলেন ঐ ছোট্ট জীবগুলো বোধহয় আমাদের চারপাশে দেখা বিভিন্ন প্রাণীর ক্ষুদ্র সংস্করণ। তাই তিনি ওগুলোর নাম দিলেন animalcule; যার অর্থ ‘ক্ষুদে প্রাণী’। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি যে প্রাণীর চেহারার সাথে ওরকম সাদৃশ্যটা নেহায়েতই বাহ্যিক। ওগুলো যে প্রত্যেকেই এক একটা কোষ আর বড় বড় জীবেরা যে ওরকম অনেক অনেক কোষের সমবায়ে তৈরি সেটা বুঝতে মানুষের আরো সময় লেগেছে। লিউয়েনহুকের ক্ষুদে প্রাণী দেখার খবর বিজ্ঞানী মহলে ছড়িয়ে পড়তেই তুমুল হৈ চৈ পড়ে গেল। অনেক বিজ্ঞানীই তখন এটা নিয়ে গবেষণায় মেতে উঠলেন। এভাবে গবেষণা চলার প্রায় দেড়শো বছর পর এ বিষয়ে যাবতীয় বিজ্ঞানীদের কাজ একত্রিত করে ফরাসী বিজ্ঞানী অঁরি দুত্রোশে প্রথম এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, সব জীবের সাংগঠনিক স্তরের সর্বনিম্ন পর্যায় হলো কোষ। এখন অবশ্য আরো নিচের সাংগঠনিক স্তরে অণু-পরমাণুর জৈবিক ক্রিয়াকলাপ আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯১১ সালে ব্রাউনীয় গতি নিয়ে পেরিনের গবেষণার ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা অণুর ধারণাটিকে নিছক ‘গাণিতিক’ মনে করতেন।

দুত্রোশে অবশ্য কোষকে কেবল জীবের গাঠনিক একক হিসেবে দেখাতে পেরেছিলেন। কোষ যে জৈবিক ক্রিয়াকলাপেরও মৌলিক একক, সেটা বুঝতে সময় লেগেছে আরো কুড়ি বছরের মতো। ১৮৩৯ সালে থিওডর শোয়ান এবং ম্যাথিয়াস জ্যাকব শ্লেইডেন তাঁদের গবেষণার মাধ্যমে দেখাতে সক্ষম হন যে, কোষ শুধু জীবের গাঠনিক এককই নয়, জীবের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ারও কেন্দ্র হলো কোষ। শোয়ান এবং শ্লেইডেন যখন জার্মানীতে বসে তাঁদের ঐ গবেষণায় মগ্ন, তখন সুইডেনের এক বিজ্ঞানী (তিনি তখন ছাত্র) করে ফেললেন এক যুগান্তকারী আবিষ্কার - ফ্রেডরিখ ভোলার অজৈব যৌগ হতে জৈবযৌগ তৈরি করে জৈবযৌগের উৎপত্তি সংক্রান্ত আধ্যাত্মবাদী প্রাণশক্তি (vital force) মতবাদের* অবস্থান নড়বড়ে করে দিলেন। এর সাথে যখন শোয়ান-শ্লেইডেনের তত্ত্ব ‘যাবতীয় জৈবনিক ক্রিয়া কোষের ভেতরকার বিক্রিয়া দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়’ - যোগ হলো, তখনই বলা যায়, জীবনের ভিত্তি সম্পর্কে আধ্যাত্মবাদীতার বিদায়ঘন্টা বেজে উঠলো। অবশ্য ঘন্টা বাজলেই আধ্যত্মবাদীতা মানে মানে কেটে পড়েনি। বিজ্ঞানের ইতিহাসে তারপর বেশ ক’বার তাকে বেশ করে গলাধাক্কা দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানের রঙ্গমঞ্চে বিশেষ সুবিধা করতে না পারলেও এখনো সে নির্লজ্জের মতো অনেকের মনের মধ্যে গ্যাঁট হযে বসে আছে!

শোয়ান-শ্লেইডেনের তত্ত্বে একটা অপূর্ণতা ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন কোষ বুঝি তৈরি হয় তার গাঠনিক উপাদানগুলোর এক বিশেষ স্বতঃস্ফূর্ত কেলাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। একটি কোষ যে আরেকটি কোষ থেকে উৎপন্ন হয় সেটা প্রমাণ করে ১৮৫৮ সালে জার্মান বিজ্ঞানী রুডল্ফ ভারকৌ কোষতাত্ত্বিক স্বীকার্যকে পূর্ণতা দিলেন।

এই মতবাদ অনুসারে জৈবনিক ক্রিয়াকলাপকে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের নিয়মে বোঝা সম্ভব নয়। জীবনের রহস্য বিজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরে - এটাই এর মূল কথা।

নিরবিক ডট কম একটি প্রশ্ন উত্তর সাইট। এটি এমন একটি প্লাটফরম যেখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।আর আপনি যদি সবজান্তা হয়ে থাকেন তাহলে অন্যের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন।