নিরভিকে ডট কমে আপনাকে স্বাগতম।এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।প্রশ্ন করতে Ask a Question ক্লিক করুন।
2 like 0 dislike
19 views
asked in বিজ্ঞান by (1,626 points)
closed by
closed with the note: only admin can answere this

1 Answer

0 like 0 dislike
answered by (1,626 points)

ব্যর্থ পিয়ার-রিভিউ এবং ভুয়া জার্ণাল

ধরা যাক, তোমার এমন ক’জন সহপাঠী আছে যারা প্রায়ই উদ্ভট তাক-লাগানো কথা বলে। তাই তাদেরকে ক্লাসের অন্যরা বিশেষ পাত্তা দেয় না। তারপরও তাদের উৎসাহের কমতি নেই। একদিন যদি দেখো যে তারা সব একজোট হয়ে তাদের উদ্ভট কথাগুলো বিশ্বাস করার দাবী জানাচ্ছে তাহলে তুমি কী করবে? হতে পারে, তাদের কথাগুলো তোমার প্রচলিত বিশ্বাস ও ধ্যারধারণার সাথে খাপ খায় না কিন্তু তাদের কথাগুলো সত্যিসত্যিই ঠিক। আবার, এটাও হতে পারে যে তাদের কথাগুলো নিছকই চাপাবাজি। দ্বিতীয়টি হওয়ার সম্ভাবনাই বরং বেশি [১.৪.৪ দ্রষ্টব্য]। বিজ্ঞানের জগতে উপরের দু’রকম ঘটনারই নজির আছে।

‘কোপেনহেগেন স্কুল’ খ্যাত বোর প্রমুখ বিজ্ঞানীরা যখন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্ত্ব হাজির করলেন তখন তা আইনস্টাইন সহ অনেক বিজ্ঞানীর কাছেই অদ্ভূত ও অবিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। তবে শেষমেষ এটা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না কারণ বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বিচারে তাতে কোনো ফাঁক পাওয়া যায়নি, বরং প্রচলিত তত্ত্বের চেয়ে তার যথার্থতা বেশি প্রমাণিত হয়েছে। এরকম নজিরে উৎসাহিত হয়েই কি না কে জানে, ইদানিং একদল মানুষ ‘বিজ্ঞানী’ সাজার চেষ্টা করছেন। মূলধারার বিজ্ঞানীদের কাছে পাত্তা না পেলেও সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের সমাদর বাড়ছে বৈ কমছে না! এরকম একদল মানুষ নিজেদেরকে ‘ক্রিয়েশন সায়েন্টিস্ট’ বলে পরিচয় দেন। তাঁদের সবেধন নীলমণি তত্ত্বটির নাম ‘ক্রিয়েশন সায়েন্স’ ওরফে ‘ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’ (সংক্ষেপে: আইডি)। এই ক্রিয়েশন সায়েন্টিস্টদের ধ্যান-জ্ঞান একটাই। মহাবিশ্বের উদ্ভব থেকে শুরু করে মানুষের উৎপত্তি - সবই ধর্মগ্রন্থে আগে থেকেই ব্যাখ্যা করা আছে এবং সেসব ব্যাখ্যা যে বৈজ্ঞানিক তা প্রমাণ করা। সায়েন্টিস্টরা তথ্য সংগ্রহ করে সেখান থেকে সিদ্ধান্ত নেন আর আমাদের ক্রিয়েশন সায়েন্টিস্টরা করেন উল্টোটা, তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছেন যে ধর্মগ্রন্থ যা বলে সব ঠিক, তাই সেই সিদ্ধান্তকে অক্ষুণ্ন রাখা যায় বেছেবেছে এমন তথ্যই তাঁরা জড়ো করেন। এটাকে আর যাই হোক বিজ্ঞান বলা যায় না। তাই কোনো বৈজ্ঞানিক জার্ণালই তাঁদের এই তত্ত্বের সমর্থনে কোনো নিবন্ধ প্রকাশ করতে রাজী হয় না। পিয়ার-রিভিউতেই বাদ পড়ে যায়।

শেষমেষ কী আর করা! দুনিয়ার তাবৎ ‘বাঘা বাঘা’ ক্রিয়েশন সায়েন্টিস্ট মিলে ঠিক করলেন এর একটা বিহিত করতে হবে। তাঁরা নিজেরাই একটা ‘বৈজ্ঞানিক’ জার্ণাল বের করলেন - ইন্টারন্যাশনাল জার্ণাল অব ক্রিয়েশন রিসার্চ (IJCR)। অন্যান্য বৈজ্ঞানিক জার্ণালের মতো এটারও সম্পাদক এবং রেফারি আছে, তবে পার্থক্য হলো - তাঁরা সবাই এক একজন ক্রিয়েশন সায়েন্টিস্ট এবং যথারীতি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নির্মাণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ধার ধারেন না। IJCR এর ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ আছে:

“IJCR হলো একটি পেশাদার পিয়ার-রিভিউ করা জার্ণাল, যাতে বিজ্ঞানের আন্তঃশাখা গবেষণার ক্ষেত্রে সেইসব নিবন্ধ প্রকাশ করা হয় যেগুলোর তথ্যপ্রমাণ বাইবেলের বিশ্বসৃষ্টির বর্ণনার সাথে আক্ষরিকভাবে মিলে যায়।”

আর হ্যাঁ, বাইবেলের সাথে মোটেই মিল নেই বা বিরোধী, এমন বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ তারা ভুলেও প্রকাশ করে না। এর সাথে মিলিয়ে দেখো জার্ণাল অব হিউম্যান ইভোল্যুশন এর ঘোষণাপত্রটি:

“জার্ণাল অব হিউম্যান ইভোল্যুশন মানুষের বিবর্তনের প্রতিটি দিক নিয়ে রচিত সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ প্রকাশ করে থাকে। মূল লক্ষ্য হিসেবে সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয় প্রত্ন-নৃতাত্ত্বিক গবেষণাকে, যেখানে মানুষ ও অন্যান্য প্রাইমেট বর্গভুক্ত প্রজাতির ফসিল নিয়ে কাজ করা হয়েছে, এবং জীবন্ত প্রজাতিগুলোর তুলনামূলক বিচার করা হয়েছে, তা সে হোক অঙ্গসংস্থানিক কিংবা জীনগত - উভয় ধরণের তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে। এর মধ্যে পড়বে নতুন সব আবিষ্কার, নতুন ও পুরোনো উভয় প্রকার বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা এবং প্রাইমেট ভুক্ত প্রজাতিগুলোর শ্রেণীবিন্যাস ও প্রত্নজীববৈজ্ঞানিক নিরীক্ষা।”

লক্ষ্য করো, এখানে কোথাও বলা নেই যে, বিবর্তনের যে স্বরূপটির এখন প্রচলিত, নতুন তত্ত্ব সেই স্বরূপের অনুসারী হতেই হবে। নতুন তত্ত্ব প্রত্ন-নৃতাত্ত্বিক গবেষণার আলোকে যে সিদ্ধান্তই দিক না কেন, তা যদি যৌক্তিক হয়, এই জার্ণাল তা মেনে নিয়ে প্রকাশ করতে বাধ্য। হোক তা প্রচলিত তত্ত্বের বিরোধী। প্রকৃত বৈজ্ঞানিক জার্ণাল শুধু বিষয়বস্তু বেঁধে দেয়। গবেষণার সিদ্ধান্তকে বেঁধে দেয় না। যদি তা করে তখন তা আর বিজ্ঞান থাকে না। তার আরেকটি নমুনা দেখো।

IJCR এর নিবন্ধ নির্বাচনের বেলায় প্রাথমিকভাবে যেসব বিষয় বিবেচনা করা হয় সেগুলো হলো:

১)    নিবন্ধের শিরোণাম (সম্পাদক নিজে এটা পূরণ করবেন)।

২)    নিবন্ধটিকে সৃষ্টিতত্ত্ববাদী মডেলে মৌলিক অবদান রাখতে হবে।

৩)    নিবন্ধটিতে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ থাকতে হবে।

৪)    নিবন্ধে উল্লিখিত বিষয়বস্তুর সম্ভব্য বিকল্প ব্যাখ্যাসমূহ থাকতে হবে।

৫)    নিবন্ধের দূর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা নিবন্ধের মধ্যেই উল্লেখ থাতে হবে।

৬)    নিবন্ধটি যেন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পরবর্তী পর্যায়ের গবেষণার ব্যাপারে একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

৭)    নিবন্ধে ব্যবহৃত গবেষণা-প্রণালী মানসম্মত হতে হবে।

৮)    প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কৌশল ব্যবহারের পূর্ণ বিবরণ নিবন্ধে থাকতে হবে।

৯)    নিবন্ধটিতে পর্যাপ্ত উপাত্ত থাকতে হবে, যার মাধ্যমে নিবন্ধটির দাবীকৃত লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কিনা তা যাচাই করা সম্ভব হয়।

১০)    নিবন্ধের তথ্য বিশ্লেষণ যথাযথ হতে হবে।

১১)    নিবন্ধে উপস্থাপিত গাণিতিক মডেল সঠিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে এবং তার ব্যবহার নির্ভূল হতে হবে।

১২)    নিবন্ধে উপস্থাপিত গাণিতিক মডেল, নিবন্ধের উদাহরণসমূহ ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।

১৩)    নিবন্ধটিতে যৌক্তিক ত্রুটি থাকা চলবে না।

১৪)    ধর্মগ্রন্থের প্রতি নিবন্ধটির অবিচল আস্থা থাকতে হবে।

এক কলস দুধের মধ্যে এক ফোঁটা গোচনা যেমন, একফর্দ শর্তের মধ্যে এই ১৪ নং টিও তেমন। সিদ্ধান্তের ব্যাপারে যদি আগে থেকেই পক্ষপাতদুষ্ট থাকি তাহলে আমার বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে কী লাভ!

উপরে বলেছিলাম, পিয়ার-রিভিউ এ না উৎরালে কোনো বৈজ্ঞানিক জার্ণাল প্রবন্ধ ছাপে না। যদি কখনও এমন হয় যে কোনো ফালতু নিবন্ধ কোনোক্রমে রেফারিদের হাত গলে কোনো নামকরা জার্ণালে ছাপা হয়ে গেল, তখন কেমন হবে? সাধারণত পত্রিকার চিঠিপত্র কলামে দেখা যায়, মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক জার্ণালে নিম্নমানের বা অযৌক্তিক প্রবন্ধ ছাপার দায় সম্পাদকের ঘাড়েই বর্তায়। ২০০৯ সালের মে মাসে বিশ্বখ্যাত এলসিভিয়ার (Elsevier) ইন্টারন্যাশনাল জার্ণাল অব কার্ডিওলজিতে এরকম একটি নিবন্ধ ছাপা হয়ে যায়। নিবন্ধে এরকম কিছু প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছিল যে, মানবদেহের বেশ কিছু জিনিস যেগুলো সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলো কোরাণে আগে থেকেই লেখা আছে। নিবন্ধে তথ্য বিশ্লেষণজনিত ত্রুটি [১.৫.১ দ্রষ্টব্য] ছিল। সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা তখন সম্পাদককে চিঠি দিতে শুরু করলেন এবং জার্ণালটির তিল তিল করে বহুবছর ধরে গড়ে তোলা সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা রাতারাতি ধুলোয় মিশে গেল। (অবশ্য এলসিভিয়ারের অন্যান্য বেশ কিছু জার্ণাল আছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আমার জানা মতে কোনো অভিযোগ নেই।) একারণেই কোনো জার্ণালে নিবন্ধ ছাপানোর ব্যাপারে সম্পাদককে শুধু সতর্ক নয়, মহাসতর্ক থাকতে হয়। আর সম্পাদকেরা এমন সতর্ক থাকতে বাধ্য হন বলেই বিজ্ঞানের জগতে আবর্জনা ঢোকার পথ পায় না।

অফটপিক: ডিসকভারি চ্যানেল এবং IJCR এর কর্ণধার একই!

নিরবিক ডট কম একটি প্রশ্ন উত্তর সাইট। এটি এমন একটি প্লাটফরম যেখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।আর আপনি যদি সবজান্তা হয়ে থাকেন তাহলে অন্যের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন।