নিরভিকে ডট কমে আপনাকে স্বাগতম।এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।প্রশ্ন করতে Ask a Question ক্লিক করুন।
2 like 0 dislike
13 views
asked in বিজ্ঞান by (1,625 points)
closed by
closed with the note: only admin can answere this

1 Answer

0 like 0 dislike
answered by (1,625 points)
 
Best answer

কখন একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে আমরা ‘প্রতিষ্ঠিত’ বলে মেনে নেবো?

এখন পর্যন্ত আলোচনায় আশাকরি এটুকু রোঝা গেছে যে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব তৈরি করাটা যে-সে ব্যাপার নয়, যে বললাম আর হয়ে গেল! লোকমুখে তত্ত্ব বা থিয়োরি কথাটা এতো গূঢ় অর্থে প্রচলিত নয়। এই যেমন ধরো, কেউ বললো, “তোমার কম্পিউটারে ভাইরাস লেগেছে, এটা আমার থিয়োরি, এব্যাপারে তোমার থিয়োরি কী বলে?” - এখানে থিয়োরি শব্দটা মতামত অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে; আবার, “এতো থিয়োরি আউড়ে লাভ নেই, প্র্যাকটিক্যালি কাজটা করে দেখাও তো বাপু!” - এখানে থিয়োরি মানে এমন এক তত্ত্ব বোঝাচ্ছে যার প্রয়োগবাস্তবতা [১.৪.৪ দ্রষ্টব্য] নিয়ে সন্দেহ আছে; তারপর, “হুমম, এটা তো শুধু থিয়োরি, বাস্তব কিছু নয়।” - এখানে থিয়োরি অর্থ শুধুই অনুমান।

একটা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বানানো যতো কঠিন, তাকে দুনিয়ার সামনে প্রতিষ্ঠিত করা তার চেয়েও কঠিন। এব্যাপারে একজন বিজ্ঞানীর (সম্ভবত বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন) বক্তব্য মনে পড়ে গেল, “নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা পায় না যতক্ষণ না পুরোনো তত্ত্বের সমর্থক বুড়ো বিজ্ঞানীরা সব অক্কা পায় এবং তরুণ বিজ্ঞানীরা তাঁদের জায়গা দখল করে।” এটা নিছক ঠাট্টা করে বলা, তবে এতে কিছুটা সত্যতা আছে এই অর্থে যে, নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা পেতে পেতে কখনও কখনও পুরো এক প্রজন্ম বা তারচেয়েও বেশি সময় লেগে যায়। কিন্তু এতো সময় লাগার কী আছে? সেটাই আমরা এখন দেখবো।

একজন বিজ্ঞানীর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে যে ধাপটি এখন প্রায় অবিসংবাদিতভাবে পেরোতে হয় সেটি হলো কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক জার্ণালে ঐ তত্ত্বের নিবন্ধ বা গবেষণাকর্মটি প্রকাশিত হওয়া। পরীক্ষার সময় তোমার খাতাটা বেশ ক’জন বন্ধুকে দিয়ে রিভিশন দিয়ে তাদের মতামত নিয়ে ভূলত্রুটিগুলো ঠিকঠাক করে এবং লেখার মান আরেকটু উন্নত করে খাতা জমা দিতে পারলে কত ভালোই না হতো! বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রকাশ করার সময় অনেকটা এমনই করা হয়। নিজের ভূল নিজে ধরাটা কঠিন, কিন্তু তোমার সমপর্যায়ের কারো চোখে তা অনেকসময়ই সহজে ধরা পড়ে। বিজ্ঞানী প্রথমে তাঁর নিবন্ধ জার্ণালের সম্পাদকের কাছে পাঠান। সম্পাদক তখন সেটার বেশ কিছু কপি তৈরি করে এক একটি কপি এক একজন ‘রেফারি’র কাছে পাঠিয়ে দেন নিবন্ধটি যাচাই করার জন্য। এই রেফারিরা হলেন ঐ বিজ্ঞানীর সমপর্যায়ের বিজ্ঞানী, যাঁরা মোটামুটি একই বিষয় নিয়ে গবেষণা করছেন এবং প্রায় একই বা সমতুল্য পদে আছেন। এই অর্থে রেফারিরা হলেন নিবন্ধ জমাদানকারী বিজ্ঞানীর বন্ধুস্থানীয় (peer)। তাঁরা ভূলত্রুটি ধরে দিতে (review) সাহায্য করছেন বলে এই প্রক্রিয়ার নাম পিয়ার-রিভিউ। একই নিবন্ধ রিভিউ করছেন এমন দুজন রেফারি সাধারণত একে অপরের রিভিউ সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকেন। তবে ক্ষেত্রবিশেষে মুক্ত রিভিউও হয়, যেখানে সবার রিভিউ সবাই দেখতে পান। রিভিউ শেষ হলে রেফারিরা তাঁদের নিজ নিজ মত সম্পাদকের কাছে পাঠিয়ে দেন। সম্পাদক সেই মতগুলোর নিরিখে তিনটি কাজের যেকোনোটি করতে পারেন - এক. নিবন্ধটি অপরিবর্তিত অবস্থায় জার্ণালে ছাপতে পারেন, দুই. নিবন্ধের কোথাও ত্রুটি থাকলে কিংবা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকলে সেটা উল্লেখ করে নিবন্ধ জমাদানকারী বিজ্ঞানীর কাছে ফেরত পাঠাতে পারেন যাতে তিনি সেগুলো সংশোধন করে নিবন্ধটি আবার জমা দেন, অথবা তিন. নিবন্ধটি যদি অন্তঃসারশূন্য প্রমাণিত হয় তাহলে সেটা ছাপার অযোগ্য বলে ঘোষণা করতে পারেন। তাছাড়া, সম্পাদক যদি মনে করেন যে এই প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু তাঁর জার্ণালের জন্য উপযুক্ত নয়, কিন্তু বিজ্ঞানের অন্য শাখার জার্ণালে ছাপানোর চেষ্টা করা যেতে পারে সেটাও তিনি বিজ্ঞানীকে জানিয়ে দিতে কার্পন্য বোধ করেন না। আর একটা কথা, রেফরিরা পিয়ার রিভিউ করার জন্য কখনোই পয়সাকড়ি নেননা। সেটা নীতিবিরুদ্ধ। নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রসারে শরিক হতে পারার আনন্দটাই তাঁদের পারিশ্রমিক। অবশ্য রেফারি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করাটা রেফারির ‘অভিজ্ঞতা’ হিসেবে গণ্য করা হয় যা তাঁর পদোন্নতি সহ কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞানীদেরকে রেফারির দ্বায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করতেই এমন নিয়ম করা হয়েছে।

পিয়ার বিভিউ প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানকে জঞ্জালমুক্ত রাখার দ্বায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে পিয়ার-রিভিউ বিহীন কোনো তত্ত্ব বিজ্ঞানীমহলে গৃহীত হয় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পিয়ার-রিভিউ এর ইতিহাস সবচেয়ে প্রাচীন। নবম শতকের শেষার্ধে সিরিয়ার চিকিৎসকেরা সব রোগীর চিকিৎসার পূর্ণ বিবরণ রাখতেন, যা অন্যান্য চিকিৎসকেরা পরে যাচাই করে দেখতেন যে কোনো ভূল চিকিৎসা হয়েছে কি না। তবে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় পিয়ার-রিভিউ এর ইতিহাস অতোটা পুরোনো নয়। একটা সময় ছিল যখন জ্ঞানচর্চা এক বিশেষ শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। বই বের করাটাও ছিল বেশ ঝামেলার একটা কাজ। এখনকার মতো ‘কাজ নেই তো সামনের একুশেতে একটা বই ছাপাই’ ধরণের অবস্থা তখন চিন্তাই করা যেতো না। আর ইন্টারনেটে যাচ্ছেতাই প্রকাশ করার স্বাধীনতা তো এই সেদিনের কথা (আমি এই স্বাধীনতার পূর্ণ ব্যবহার করছি!)। অ্যারিস্টটল থেকে নিউটন - কেউই পিয়ার-রিভিউ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাননি। তাঁরা তাঁদের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন সরাসরি বই আকারে। কিন্তু এখন বইপত্র আর ইন্টারনেটে তথ্যের যে লাগামছাড়া জোয়ার এসেছে সেখানে পিয়ার-রিভিউ ছাড়া বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা দাবী করা অসম্ভব। অবশ্য পিয়ার-রিভিউও যে মাঝে মাঝে ব্যর্থ হয় না, তা নয়। পরবর্তী লেখায় সেটা বিস্তারিত থাকবে।

পিয়ার-রিভিউ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তাই নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে সময় লাগে। শুধু পিয়ার-রিভিউ হয়ে জার্ণালে প্রকাশিত হলেই তো আর কাজ শেষ নয়। সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের কাছে মূল্যায়িত হওয়ারও ব্যাপার আছে। সব মিলিয়ে বহুবছর পার হয়ে যায়। একারণেই তো নোবেল পুরষ্কার এতো দেরিতে দেওয়া হয়, কোনোকিছু আবিষ্কার হওয়ার অনেক দিন পর সেটার জন্য নোবেল দেওয়া হয়। সময় লাগার এই কারণ ছাড়াও আরো একটা কারণ আছে, সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ডারউইন যখন প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের আলোকে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষ সহ সকল প্রজাতির উদ্ভবকে ব্যাখ্যা করার মত অবস্থায় এলেন তখন তাঁর হাতে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘ কুড়ি বছর অপেক্ষা করেছিলেন তাঁর মত প্রকাশের জন্য। কেন? সমাজের ভয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভয়! বিজ্ঞানী তাঁর সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো জীব নন। তিনি যেমন এগুলো দিয়ে প্রভাবিত হন তেমনি এগুলোও তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়। সম্পর্কটা দ্বান্দ্বিক।

নিরবিক ডট কম একটি প্রশ্ন উত্তর সাইট। এটি এমন একটি প্লাটফরম যেখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।আর আপনি যদি সবজান্তা হয়ে থাকেন তাহলে অন্যের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন।
...