নিরভিকে ডট কমে আপনাকে স্বাগতম।এখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।প্রশ্ন করতে Ask a Question ক্লিক করুন।
2 like 0 dislike
4 views
asked in বিজ্ঞান by (1,626 points)
closed by
closed with the note: only admin can answere this

1 Answer

0 like 0 dislike
answered by (1,626 points)
 
Best answer

পর্যবেক্ষণ-->প্রকল্প-->তত্ত্ব : বেকনীয় পদ্ধতি

হলে আমার যে পি.সি. টা আছে সেটাতে গত কয়েকমাস যাবৎ সমস্যা হচ্ছিল। পরীক্ষার কারণে সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে পারিনি। সমস্যাটা হলো: একটানা কয়েক ঘন্টা পি.সি. চালু রাখলে হ্যাং করছিল এবং পিঁপ-পিঁপ জাতীয় একধরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আর রিস্টার্ট দিলে উইন্ডোজের বুট স্ক্রীন এসে অনন্তকাল ধরে বসে থাকছিল। বায়োসে যে ঢুকবো তারও উপায় নেই, কীবোর্ড থেকে সি.পি.ইউ. তখন কোনো ইনপুট নেয়না। অনেকবার চেষ্টা করার পর পি.সি. আমাকে করুণা করেই বোধহয় একবার ঠিকমতো বুট হয় কিন্তু কিছুক্ষণ চালানোর পর আবার তথৈবচ। উপরের পুরো ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এখানেই শেষ নয়! কীবোর্ডটা মাঝেমধ্যে যখন কাজ করতো তখন দেখা গেল তার কয়েকটা কী মৃত। সেগুলো চাপলে মনিটরে কোনো আউটপুট দেখা যায় না। নতুন কীবোর্ড কিনলাম। দেখা গেল, তার সব কী কাজ করছে। তার মানে কীবোর্ডের সমস্যাটা বোধহয় কীবোর্ডেরই সমস্যা ছিল, সি.পি.ইউ বা সফটওয়্যারের নয়। একটা সমস্যা মিটলো বটে, কিন্তু তাতে আমার পি.সি.র মূল সমস্যার কোনো সুরাহা হলো না। বলা যায়, কম্পিউটার বস্তুটা আমার একটা ইন্দ্রিয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তার এমন অসুখ আমার নিজের অসুখ বলেই বোধ হতো। ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম! প্রথমেই মাথায় এলো, ভাইরাস না তো? ভাইরাস উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের এক অপরিহার্য অংশ, তা কে না জানে! নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বোঝা গেল, না - ভাইরাস নয়। তাহলে কি কোনো সিস্টেম ফাইল করাপ্ট হয়ে গেছে? উইন্ডোজ আবার সেটআপ দিলাম। কোনো লাভ হলো না। তবে এটুকু বোঝা গেল যে সমস্যাটা সফটওয়্যারের নয়, হার্ডওয়্যারের। আমার ওয়্যারান্টির মেয়াদ শেষ। তাই মনে মনে কত টাকা গচ্চা যেতে পারে তার হিসাব কষতে কষতে পি.সি. টা সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে গেলাম। কী মুশকিল! হাসপাতালের হাওয়া গায়ে লাগতেই রোগী পুরো সুস্থ্য। সার্ভিস সেন্টারে একটানা ঘন্টার পর ঘন্টা চালু থেকেও আমার প্রাণপ্রিয় পি.সি. টুঁ শব্দটি করলো না! সবকিছু বিলকুল ঠিকঠাক। সার্ভিস সেন্টারের লোকদের মধ্যে বেশ খানিকটা বিরক্তির উদ্রেক করে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভঙ্গিতে হলে ফিরলাম। হলে পি.সি.র সংযোগ দিতেই আবার যা-তাই। নিমকহারাম পি.সি. যথারীতি আবার সেই বেয়াদবি শুরু করে দিয়েছে। পরে আবার সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে গেলাম। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। হলে ফিরলাম। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। রামটা খুলে মুছেটুছে চেপেচুপে আবার লাগালাম। শুনেছি এতে নাকি পি.সি.র অনেক সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়। কোনো লাভ হলো না। সুব্রত ভাই ইতোমধ্যে একটা লেখার ব্যাপারে তাগাদা দিতে ফোন করলেন। আমার তো তখন মেজাজ সপ্তমে। গড়গড় করে পি.সি.র সমস্যার ফিরিস্তি দিলাম। পি.সি. এমন করলে লিখবো কীভাবে? সুব্রত ভাই ঠাণ্ডা মাথার মানুষ, আমার মতো মাথাগরম না। সবকিছু ভালো করে শুনেটুনে বললেন, হুমম, ভোল্টেজের সমস্যার জন্য এমন হতে পারে। কথাটা আমার মনে ধরলো। তাইতো! হলে হয়তো তুলনামূলকভাবে লো ভোল্টেজ থাকে। সেজন্যেই সার্ভিস সেন্টারে ঠিক ভোল্টেজে পি.সি. সমস্যা করছেনা। কিন্তু তাহলে তো হলে আর সবার পি.সি. তেও একই সমস্যা হওয়ার কথা। হলের ৯০% বাসিন্দারই পি.সি. আছে। তাদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের ল্যাপটপ, বাকিরা আমার দলে - ডেস্কটপ। ডেস্কটপওয়ালাদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখলাম, কারোরই আমার মতো সমস্যা জীবনেও হয়নি। তাহলে বোধহয় ভোল্টেজের ব্যাপারটা আসল কারণ নয়। যদি হতো তাহলে অন্ততপক্ষে কারো না কারো তো একই সমস্যা হওয়া উচিত, যেহেতু সবাই একই বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছে। ভালো করে চিন্তা করলাম। ভোল্টেজ ছাড়া আর এমন কী নিয়ামক আছে যা হলে এবং সার্ভিস সেন্টারে আলাদা? হঠাৎ করে একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম। হলে আমি পি.এস.টু সংযোগ বিশিষ্ট কীবোর্ড ব্যবহার করি। ডেস্কটপ ব্যবহারকারীর বেশিরভাগই তাই করে। আমার নতুন কেনা কীবোর্ডটাও পি.এস.টু। তবে যতবারই সার্ভিস সেন্টারে গেছি তারা আমার পি.সি. (সি.পি.ইউ) তে ইউ.এস.বি সংযোগবিশিষ্ট কীবোর্ড ব্যবহার করেছে। একথা মনে হওয়ামাত্র আমি পি.সি চালু করলাম। যথারীতি উইন্ডোজের বুট স্ক্রীন এসে তা হ্যাং করলো। কীবোর্ডের সংযোগ খুলে দিলাম। সাথে সাথে হ্যাং ছুটে গেল। বুট সম্পন্ন হয়ে ওয়েলকাম স্ক্রীন এলো। রিস্টার্ট দিলাম। এবারে কীবোর্ডের সংযোগই দিলাম না। কোনো হ্যাং ছাড়াই বুট হয়ে এবার ওয়েলকাম স্ক্রীন এলো। বেশ কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করে একই ফল পেলাম। নিচতলার বন্ধু সুজনের কাছ থেকে তার ইউ.এস.বি কীবোর্ডটা ধার নিলাম। তারপর সেটাকে সংযোগ দিয়ে একটানা চৌদ্দ ঘন্টা পি.সি. চালু রাখলাম। কোনো সমস্যা হয়নি। তারপরই বুঝে গেলাম কী করতে হবে। পি.এস.টু কীবোর্ডটা মাত্র দুদিন আগে কেনা। সেটা পাল্টে একটা ইউ.এস.বি কীবোর্ড নিয়ে এলাম। এখন সেই কীবোর্ডেই এই লেখাটা টাইপ করছি।

এখন পুরো ঘটনাটা ‘বৈজ্ঞানিকভাবে’ বিশ্লেষণ করা যাক। প্রথমে পর্যবেক্ষণ থেকে জানলাম যে আমার পি.সি. তে সমস্যার অস্তিত্ব আছে। তারপর সেই সমস্যার সমাধানের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প (hypothesis) গ্রহণ করলাম এবং সেগুলো একে একে পরখ করে দেখলাম। যেমন: ‘ভাইরাস আছে বলে সমস্যাটা হচ্ছে’ প্রকল্পটার জন্য এন্টিভাইরাস দিয়ে স্ক্যান করলাম, দেখা গেল প্রকল্পটি মিথ্যা, তখন পরের প্রকল্প ‘সিস্টেম ফাইল করাপ্ট হওয়াতে সমস্যাটা হচ্ছে’ প্রকল্প নিলাম এবং উইন্ডোজ সেটআপ দেওয়ার পর সেটাও মিথ্যা হয়ে গেল। এভাবে সফটওয়্যারের সমস্যা-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলো আগে বাতিল (exclude) করে তবেই হার্ডওয়্যারের প্রতি মনোযোগ দিলাম। হার্ডওয়্যারের প্রকল্পগুলো ছিল এরকম, ‘রামের সংযোগের সমস্যার জন্য সমস্যাটা হচ্ছে’, ‘ভোল্টেজের সমস্যার জন্য সমস্যাটা হচ্ছে’ এবং ‘পি.এস.টু কীবোর্ডের জন্য সমস্যাটা হচ্ছে’। সর্বশেষ প্রকল্পটি পর্যবেক্ষণ থেকে সঠিক প্রমাণিত হওয়ায় সেটা আর প্রকল্প থাকলো না, তত্ত্বের (theory) মর্যাদা পেলো। তখন সেই তত্ত্বটি ব্যবহার করে আমাদের আলোচ্য সমস্যার সমাধান হলো।

এভাবে পর্যবেক্ষণ থেকে প্রকল্প গ্রহণ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক প্রকল্পটি বেছে নিয়ে তত্ত্ব তৈরি করার কেতাবি নাম ‘বেকনীয় পদ্ধতি’। অনেক সময় একে ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি’ও বলে যদিও বেকনীয় পদ্ধতি আসলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির একটি বিশেষ রূপ মাত্র এবং সত্যিকার অর্থে বেকনীয় পদ্ধতি একেবারেই তাত্ত্বিক ধারণা। বাস্তবে যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আমরা (এবং দুনিয়ার তাবৎ বিজ্ঞানীরা) ব্যবহার করি তা বেকনীয় পদ্ধতি থেকে অনেক আলাদা। তবে ধাপে ধাপে বোঝার জন্য বেকনীয় পদ্ধতি থেকে শুরু করা ভালো।

দার্শনিক রজার বেকন এই বেকনীয় পদ্ধতির প্রবক্তা। এই পদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রকল্প যাচাই করার বাধ্যবাধকতা। তাঁর আগে, যেমন ধরো, এরিস্টটলের আমলে (এরিস্টটলের আমল কিন্তু এরিস্টটলের মৃত্যুর বহুশতাব্দী পর পর্যন্ত ধরতে হবে) সামান্য একটু-আধটু পর্যবেক্ষণ করেই একলাফে ‘তত্ত্ব’ তৈরি করা হতো। মাঝখানে একের পর এক প্রকল্প তৈরি করে হাতে-কলমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করাটা নেহায়েত সময়ের অপচয় মনে করা হতো। ‘বিশুদ্ধ চিন্তা থেকেই বিশুদ্ধ তত্ত্ব নির্মান করা যায়’ - এটাই ছিল সে আমলের সর্বজনগ্রাহ্য ধারণা। এজন্যে এরিস্টটলের ‘ভারী বস্তুর দ্রুত পতন’ তত্ত্ব বহুকাল কেউ যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করেনি।

অসুখ কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তরটাও একইভাবে দেওয়া হতো। আদিম সমাজে ধারণা করা হতো অসুখ অশুভ শক্তির প্রভাব। ধর্ম (religion) গড়ে ওঠার আগেই মানুষ ‘যাদুবিশ্বাস’ (magic belief) থেকে এসব অশুভ শক্তি তাড়ানোর নানা উপায় খুঁজেছে। এখনকার ধর্মগুলোতেও রোগমুক্তির সাথে প্রার্থনার যোগসূত্র উল্লেখ আছে, যা হয়তো সেইসব যাদুবিশ্বাস থেকেই ধার করা। ওঝা সম্প্রদায় হলো মানুষের ধর্ম-পূর্ববর্তী জাদুবিশ্বাসের জীবন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। অসুখের কারণ সম্পর্কে আদিম মানুষের এই ধারণা যে একেবারে আকাশ থেকে পাওয়া, তা বলা যাবে না। এর পেছনে নিশ্চয়ই তাদের সামান্য হলেও পর্যবেক্ষণ ছিল। যেমন, তারা হয়তো দেখেছে অশুভ শক্তিকে আচ্ছামতো গালাগালি করার পর কারো অসুখ ভালো হয়েছে বা কোনো উপকার হয়েছে। অন্ততপক্ষে, কোনো বদলোককে ঠিকমতো শায়েস্তা করলে যে তার হাত থেকে নিরাপদ থাকা যায় সেটা তো মানুষ বহুদিন থেকেই জানে। সেই একই নীতি তারা অসুখরূপী অশুভ শক্তির উপর প্রয়োগ করতে চেয়েছে। সমস্যাটা হলো তারা তাদের এই প্রকল্পকেই তত্ত্ব মনে করেছে। সেটা যাচাই করার কথা তাদের মাথায় আসেনি। পরে যখন এগুলো যাচাই করা শুরু হলো তখন দেখা গেল, যারা প্রার্থনা করে এবং যারা প্রার্থনা করেনা - উভয়ের মধ্যে অসুখের হার সমান। অর্থাৎ কোনো প্রকল্প সঠিক কিনা তা যাচাই করার জন্য শুধু ঐ প্রকল্পের পক্ষের তথ্য-উপাত্ত জড়ো করা যথেষ্ট নয়। বিপক্ষের উপাত্তগুলো বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার পি.সি.র সমস্যা যে ভোল্টেজ সংক্রান্ত হতে পারে তার পক্ষের তথ্য ছিল, সার্ভিস সেন্টারের ভালো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। তবে হলের অন্যান্য ডেস্কটপ ব্যবহারকারীদের আমার মতো সমস্যা না হওয়াতে সেই প্রকল্প ধোপে টিকলো না। প্রকল্পের পক্ষে যতো উপাত্ত জড়ো হবে, প্রকল্পটি ততো পোক্ত হবে, তবে এটা যেহেতু আরোহী পদ্ধতি তাই শতভাগ নিশ্চিত কখনোই হওয়া যাবে না। অন্যদিকে, প্রকল্পের বিপক্ষে একটি উপাত্তই যথেষ্ট তাকে বাতিল করার জন্য। আইনস্টাইনের বিরুদ্ধে যখন একশো বিজ্ঞানী একজোট হয়ে ‘Hundred Scientists Against Einstein’ প্রকাশ করলেন তখন আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘আমি যদি ভূল হয়ে থাকি তাহলে তা দেখানোর জন্য তো একজনই যথেষ্ট’।

আদিম মানুষ হয়তো দেখেছে অশুভ শক্তিকে গাল পাড়লে মঙ্গল হয়, কিন্তু গাল না পাড়লেও যে মঙ্গল হয় এবং গাল পাড়ার পরও যে অমঙ্গল হয় সেটা তাদের চোখ এড়িয়ে গেছে। বেকন সাহেব সেটাই আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন।

নিরবিক ডট কম একটি প্রশ্ন উত্তর সাইট। এটি এমন একটি প্লাটফরম যেখানে আপনি আপনার প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন।আর আপনি যদি সবজান্তা হয়ে থাকেন তাহলে অন্যের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন।